গ্রেট নিকোবর প্রোজেক্ট: রাষ্ট্রীয় উচ্চাশা, নাকি মহার্ঘ ভুল
কল্যাণ রায়
আজ প্রায় এক দশক হল নরেন্দ্র মোদী সরকার গ্রেট নিকোবর
দ্বীপ (জিএনআই) প্রকল্পকে একটি বৃহৎ বিনিয়োগ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে, বলা হচ্ছে
এটি ভারতকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন ব্যবসায় একটি প্রধান শক্তি হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত করবে। প্রকল্পটিতে একটি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর নির্মাণের কথা বলা
হয়েছে, যেটা নাকি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে এবং এই ক্ষুদ্র দ্বীপটিতে
পর্যটক টেনে আনবে।
উল্লেখ করা
দরকার, কেন্দ্রীয় সরকার ও নীতি আয়োগের পেশ করা কোনো পরিকল্পনা নথিতেই এর পিছনে আরক্ষা
সংক্রান্ত কোনো কৌশলী পদক্ষেপের ইঙ্গিত নেই।
অথচ এই পরিকল্পনা ঘিরে
সমালোচনা যেই বাড়তে শুরু করল অমনি শুরু হল জিএনআই প্রকল্পের গুরুত্ব নিয়ে একটি নতুন
ভাষ্য তৈরির চেষ্টা। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে— যেখানে চীন হল অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি,
এর সামরিক গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে এখন। এই ধরনের ভাষ্যে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরটিকে
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গৌণ বিষয় হিসেবে ধরা হচ্ছে এবং আলোচনায় এটাও কখনও আসছে না যে গুরুত্বপূর্ণ
মালাক্কা প্রণালী ও সিক্স ডিগ্রি চ্যানেলে নজরদারির জন্য কেন্দ্রীয় সরকার অন্য
কোনো সামরিক বিকল্প খুঁজে দেখেছে কিনা।
ট্রান্সশিপমেন্ট
বন্দর হল একটি সামুদ্রিক ট্রানজিট কেন্দ্র যেখানে বড় সমুদ্রগামী জাহাজ (মাদার
শিপ) থেকে কার্গো কন্টেনার খালাস করে ছোট জাহাজ (ফিডার শিপ)-এ তোলা হয় তাদের
চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। আবার উল্টো পথেও একই ভাবে কাজটি হয়। যেহেতু
অতি-বৃহৎ কন্টেনার জাহাজগুলি ভেড়ার জন্য অনেক বেশি গভীরতার জল এবং বিস্তৃত বন্দর
পরিকাঠামোর প্রয়োজন, তাই সেগুলো ছোট আঞ্চলিক বন্দরের পরিবর্তে শুধুমাত্র বিশেষ
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঞ্চলে অবস্থিত হাব বন্দরেই নোঙর করতে পারে, এবং তাদের সংখ্যাও
সীমিত।
ঐতিহাসিকভাবে, দেশের অধিকাংশ
ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গো কলম্বো (শ্রীলঙ্কা), সিঙ্গাপুর, দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরশাহি) এবং পোর্ট
ক্লাং (মালয়েশিয়া)-এর মতো বিদেশি হাবের মাধ্যমে চলাচল করে।
জিএনআই-তে
ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরটির প্রস্তাব করা হয়েছিল উপকূলের কাছাকাছি ১০-১৫ মিটার
প্রাকৃতিক জলের গভীরতার কারণে, যা অতি-বৃহৎ কন্টেনার জাহাজগুলির পক্ষে সুবিধাজনক, এবং আরও এক
কারণ, পূর্ব-পশ্চিম আন্তর্জাতিক শিপিং করিডোরটিও রয়েছে এর কাছাকাছি। উদ্দেশ্য ছিল
এমন একটা কার্গো হাব তৈরি করা হবে যা বর্তমানে যেসব ট্রাফিক শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর ও
মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে, সেগুলোকে আকর্ষণ করবে।
হাবটিকে সক্রিয়
রাখার জন্য আরও যা যা জরুরি— একটি বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, টাউনশিপ, সড়ক যোগাযোগ
ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সুবিধা ইত্যাদি সবই এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। একমাত্র
সামরিক উপাদান ছিল এখানকার বিমানবন্দরটি, যেটিকে দুই কাজেই ব্যবহার করা যাবে বলে ধরা
হয়েছিল।
কোনো বিকল্প
চিন্তাভাবনার অবকাশ মেলেনি কি?
গ্রেট নিকোবর
দ্বীপের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না, কিন্তু যে-প্রশ্নটির উত্তর
মিলছে না তা হল: জিএনআই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে মোদী সরকার কি এর বিকল্প কী
হতে পারে তা নিয়ে যথাযথ বিবেচনা করেছিল?
অবসরপ্রাপ্ত
রিয়ার অ্যাডমিরাল সুধীর পিল্লাই, ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রাক্তন ফ্ল্যাগ অফিসার,
পরিস্থিতিটি বিশ্লেষণ করার সময় প্রশ্ন তুলেছেন, গালাথিয়া বে, ক্যাম্পবেল বে, নানকৌরি হার্বার
এবং ক্যাম্পবেল বে–সাবাং-এর মধ্যে ভাগ ভাগ করে নির্মাণের মডেল—এই বিকল্পগুলোর তুলনামূলক
মূল্যায়ন আদৌ করা হয়েছিল কি? তাছাড়া ভিজিঞ্জাম, বাধবন, মাতারবাড়ি, পাটিম্বান ও তোয়াস বন্দর ইত্যাদি বন্দর
যেগুলি জিএনআই-এর আঞ্চলিক প্রতিযোগী, তাদের পাশে বাণিজ্যিক লাভযোগ্যতার নিরিখে এই
প্রকল্পটি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সেটাও কি খুঁজে দেখা হয়েছে?
তিনি আরও প্রশ্ন
তুলেছেন যে সামরিক উপযোগিতা বিচারের সময় কি দ্বিমুখী ব্যবহারযোগ্য বিমানঘাঁটি এবং পোক্ত
নৌ-ঘাঁটি গড়ার কাজে যা দরকার তার সঙ্গে ১ কোটি ৬০ লক্ষ টিইইউ (TEU, ‘টোয়েন্টি ফিট
ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট’, কন্টেনার কার্গোর আয়তনের একক) কমার্শিয়াল মেগা-হাব গড়ার কাজে যা দরকার তার তুলনামূলক বিচার করা হয়েছিল? এ
ছাড়াও, ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন ২০৫০ সালের মধ্যে শিপিংয়ের জন্য যে
নেট-জিরো কার্বন নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে সেটা পূরণের জন্য জিএনআই
প্রকল্প কি ‘গ্রিন বাংকারিং’ স্ট্র্যাটেজি (কয়লা-তেল ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানির
ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যে গৃহীত ব্যবস্থাপনা) আয়ত্ত করেছে? সেটা না করা হলে পূর্ণ
কার্যক্ষমতায় পৌঁছনোর পর বন্দরটির পক্ষে গ্রাহকদের আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
“এ ধরনের কোনো বিশ্লেষণই প্রকল্প সংক্রান্ত এবং
জনসাধারণের কাছে সুলভ কোনো নথিতে সুসংহত আকারে পাওয়া যাবে না। পাবলিক রেকর্ড বলতে
যা আছে তা পড়ে এমন মনে হয় না যে বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে একটা উপসংহারে পৌঁছানো হল,
বরং তা আরও বেশি করে একটি নির্ধারিত সিদ্ধান্তের কথা বলে, যাকে ঘিরে ধাপে ধাপে
প্রথামাফিক চাহিদা মেটানোর জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু বিশ্লেষণ সাজানো হয়,” লিখেছেন রিয়ার অ্যাডমিরাল পিল্লাই।
যেদিন থেকে
প্রকল্পটি গতি পেয়েছে, সেই দিন থেকেই পরিবেশবাদীরা, নাগরিক অধিকার
সংক্রান্ত অ্যাকটিভিস্টরা এবং বিরোধী দলগুলি সরকারের বিরুদ্ধে পরিবেশ, বন ও বন্যপ্রাণী
সংক্রান্ত ছাড়পত্র আদায়ের বিধিবদ্ধ নিয়ম লঙ্ঘনের এবং বন অধিকার আইন, ২০০৬-এর বিধান
মেনে না চলার অভিযোগ আনতে শুরু করেছে।
সপ্তাহ তিনেক
আগে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী গ্রেট নিকোবর দ্বীপ পরিদর্শন করে এসেছেন এবং সেখানে
তিনি নিকোবরী প্রতিনিধি ও অ্যাকটিভিস্টদের সঙ্গে দেখা করেন। এঁরা বাস্তুচ্যুতি, পরিবেশ বিনাশ
এবং আদিবাসী উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলির (বিশেষ করে শোম্পেন উপজাতির) ওপর এই
প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এর পরেই এই বিরোধী দলটি
কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ তীব্রতর করে তোলে। তাঁরা প্রকল্পটিকে “পরিবেশের
দিক থেকে দুর্যোগপূর্ণ” এবং “কৌশলগতভাবে অস্বচ্ছ” উদ্যোগ বলে অভিহিত করেছেন,
তাঁদের মতে যথাযথ বিবেচনা বা ঝুঁকি সামলানোর ব্যবস্থা ছাড়াই এটিকে জোর করে চাপিয়ে
দেওয়া হচ্ছে। দুটি পৃথক চিঠিতে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম
রমেশ নিয়ন্ত্রক বিধি লঙ্ঘনের দিকে আঙুল তুলেছেন।
“যেসব সমীক্ষার ভিত্তিতে পরিবেশগত ছাড়পত্র
দেওয়া হয়েছে, সেগুলো এমনকী ‘র্যাপিড ইআইএ’ (এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট
অ্যাসেসমেন্ট)-ও নয়, এবং মাত্রই সামান্য কয়েকটা দিন ও সপ্তাহের মধ্যে সংগ্রহ
করা প্রারম্ভিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং একেবারে অপর্যাপ্ত। এই
প্রতিবেদনগুলো যেমন বিজ্ঞানের দিক থেকে অপমানকর তেমনই ইআইএ প্রক্রিয়াটাকেই এগুলো উপহাস
করছে,” রমেশ লিখেছেন।
বিচার বিভাগীয়
পর্যালোচনা
সরকারকে
অস্বস্তিতে ফেলে দিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট এই মাসের শুরুর দিকে তিনটি পাবলিক
ইন্টারেস্ট লিটিগেশন শুনতে সম্মত হয়েছিল, এই অভিযোগগুলোতে বলা হয়েছিল যে ছাড়পত্র
দেওয়ার ফলে উপজাতিদের অরণ্যের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। সরকারের আপত্তি খারিজ করে হাইকোর্ট উল্লেখ
করে যে এই ধরনের প্রকল্পগুলি বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় আসতেই পারে কারণ
নিকোবরের উপজাতীয় জনসমষ্টিটি একটি “অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপজাতীয় গোষ্ঠী”।
কেন্দ্রীয়
সরকার তার নিজের পক্ষে বলতে গিয়ে প্রকল্পটিকে জোরালোভাবে
সমর্থন করে, তারা যুক্তি দেয় যে এর “মহান জাতীয় গুরুত্ব”
রয়েছে এবং এটি ভারতের সমুদ্র-নিরাপত্তা, ট্রান্সশিপমেন্ট বাণিজ্য ঘিরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা
এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আরক্ষাগত কৌশলের কারণে অপরিহার্য। রাহুলের সফরের
পরে-পরেই, কেন্দ্রীয় সরকার দুটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলেছে যে জিএনআই প্রকল্পের
লক্ষ্য দ্বীপটিকে একটি স্ট্র্যাটেজিক সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করা, একই সঙ্গে তারা দাবি করে যে
পরিবেশ সংক্রান্ত বিধিনিয়মও এখানে অনুসরণ করা হচ্ছে। কিন্তু এর কোনোটিতেই সমালোচকরা
যেসব প্রশ্ন তুলেছেন সেসবের কোনো উত্তর নেই।
আরও অনেক
উত্তরহীন প্রশ্ন রয়েছে। জিএনআই-তে আছে একটি নৌ বিমান ঘাঁটি আইএনএস বাজ (INS
Baaz) এবং ক্যাম্পবেল
বে-তে রয়েছে একটি প্রাকৃতিক বন্দর, যা মালাক্কা প্রণালীর মুখোমুখি। “বছরের পর বছর ধরে, ‘এঅ্যান্ডএন (আন্দামান
অ্যান্ড নিকোবর) কমান্ড’ রানওয়ে বাড়ানোর জন্য এবং বন্দরটিকে বড় বিমান ও জাহাজ
ধারণের জন্য সংস্কার করার আবেদন জানিয়ে আসছে, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি,” বলেছেন
নৌবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ।
“বছরের পর বছর, সুনামি ত্রাণ বস্তিতে
বসবাসকারী নিকোবরীরা বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত ভাবে তাদের পূর্বপুরুষের
ঐতিহ্যবিজড়িত জমিতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছে এবং প্রশাসন তাদের ফিরে যেতে
সাহায্য করুক এই আর্জি জানাচ্ছে। এসব অনুরোধে আদৌ কোনো ফল হয়নি,” উল্লেখ করেছেন
রমেশ।
একটি গর্তও
খোঁড়া হয়নি, এরই মধ্যে প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২,০০০ কোটি টাকারও
বেশি। যেহেতু সিমেন্ট ও ইস্পাত থেকে শুরু করে শ্রমিক ও কর্মী অবধি সবকিছুই ওই
দ্বীপে নিয়ে যেতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে তাদের সেখানে থাকার ব্যবস্থা জোগাতে
হবে, তাই প্রকল্পের ব্যয় আরও বহুগুণ বাড়বে নিশ্চিত। বর্ষা, সামুদ্রিক স্রোত
ও ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি ইত্যাদি প্রাকৃতিক প্রভাব ওই ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
কাজে নামার আগে
এ সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা কি কেন্দ্রের পক্ষে বুদ্ধিমানের
কাজ হত না? নাকি মোদী সরকার ‘চার ধাম’-এর মতো এমন এক পদ্ধতি গ্রহণ করবে যে, পরিবেশ
সংক্রান্ত সমস্ত ঝুঁকিকে শেষ মুহূর্তে পায়ে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হবে জাতীয় নিরাপত্তার
ওজর তুলে— এমনকী সামরিক প্রসঙ্গগুলো আদপে মূল পরিকল্পনার অংশ না হওয়া
সত্ত্বেও! কী হবে তা কেবল সময়ই বলতে পারে।
[মূল ইংরেজি রচনাটি Great Nicobar project:
National ambition or costly misstep? নামে ডেকান হেরাল্ড -এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছিল,
১৭ মে ২০২৬ তারিখে। https://www.deccanherald.com/amp/story/specials/great-nicobar-project-national-ambition-or-costly-misstep-4005726]
ব্যবহৃত ছবি: রবিশংকর পি., Great Nicobar: A contemporary Conservation
Timeline-এ প্রকাশিত

No comments:
Post a Comment