আমার টাংস্টেন মামা
অলিভার স্যাকস
![]() |
অলিভার স্যাকস (১৯৩৩-২০১৫) |
আমার বাল্যস্মৃতির
অনেকখানি জুড়ে আছে বিভিন্ন ধাতু। মনে হয় আমার জীবনের গোড়া থেকেই যেন তারা
প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল। বিশ্বজুড়ে পাঁচমেশালি হরেকরকমবা-র ভেতরেও তারা আলাদা
তাদের আলো ঠিকরানো ঔজ্বল্য, রজতশুভ্র রূপ, মসৃণতা আর ওজনদার বৈশিষ্ট্যের কারণে।
স্পর্শে আনে শীতল ভাব, টোকা দিলে ওঠে নিক্বণ।
সোনার
হলুদাভ বর্ণ ও ভারী ওজন আমার খুব ভালো লাগে। আমার মা মাঝেসাঝে তাঁর হাতের আঙুলে
থাকা বিয়ের আংটিটা খুলে নিয়ে আমাকে দেখতে দিতেন, বলতেন, সোনা অজর, অমর। এই ধাতু
মলিনতা মুক্ত, সিসার থেকেও ভারী। ততদিনে আমার সিসার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কোন একবছরে
জলকলের মিস্ত্রি একটা ভারী অথচ নরম পাইপ ফেলে গিয়েছিল, তার সুবাদে। মা বলতেন,
সোনাও নরম। এর প্রকৃতি কঠিন করার জন্য এর সঙ্গে অন্য ধাতু মেশাতে হয়। তামাও একই
রকম আচরণ করে, মানুষ এর সঙ্গে টিন মিশিয়ে ব্রোঞ্জ তৈরি করে। ব্রোঞ্জ! এই শব্দটাই
আমার কানে যেন যুদ্ধের ভেরি বাজিয়ে দেয় - যুদ্ধ মানেই ব্রোঞ্জ বনাম ব্রোঞ্জ, ব্রোঞ্জের
বল্লম ব্রোঞ্জের ঢালে সিধোঁতে চায়, ঢাল মানেই অ্যাকিলিসের দুর্ধর্ষ ঢাল। মা বলতেন,
তুমি চাইলে তামা আর জিঙ্কের সংকর ধাতু, পেতলও বানাতে পারো। আমাদের প্রত্যেকের নামে
একটা করে পেতলের মোমদানি ছিল – মায়ের, আমার ও আমার ভাইদের। সেগুলো হানুকা উৎসবে
কাজে লাগে। (বাবারটা ছিল রুপোর।)
তামা আমি
চিনতাম। আমাদের রান্নাঘরে ছিল গোলাপি-শুভ্র তামার ঢাউস কড়াই, যেটা বছরে একবার
মর্তে অবতরণ করত যে সময় বাগানে ন্যাসপাতি আর ক্র্যাব অ্যাপল টুসটুসে হয়ে পেকে উঠত।
আমার মা ওই কড়াইয়ে সেগুলো জ্বাল দিয়ে তাদের জেলিতে রূপান্তর ঘটাতেন।
জিঙ্কও আমার পরিচিত, আমাদের বাগানে ছিল ম্যাটমেটে নীলচে
রঙের জিঙ্কে তৈরি পাখিদের স্নানপাত্র। আর টিন তো কাছেই ছিল, মোটা টিনের পাতে আমরা
বনভোজনের স্যান্ডউয়িচ মোড়াতাম। আমার মা দেখাতেন জিঙ্ক বা টিনের পাতকে চাপ দিয়ে
বাঁকালে সেগুলো কেমন ‘কান্নাকাটি’ করে। মা বলতেন সেগুলোর স্ফটিক-কাঠামো বদলে
যাচ্ছে বলে ওরা কাঁদছে। মা ভুলেই যেতেন যে আমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর, তাঁর কথা আমার
বোধগম্য হওয়ার মতো নয়, কিন্তু তাঁর উচ্চারিত শব্দগুলো আমাকে সম্মোহিত করে রাখত, আমি
আরও জানতে চাইতাম।
আমাদের বাগানে ঢালাই লোহায় তৈরি একটা পেল্লায় লন রোলার ছিল, বাবা বলেছিলেন তার ওজন পাঁচশো পাউন্ড। আমরা ছেলেবেলায় সেটাকে নাড়াতেও পারতাম না। বাবার গায়ে খুব জোর ছিল, তিনি এটাকে মাটি থেকে তুলে ধরতে পারতেন। রোলারটা সব সময়েই মরচে-মলিন, এটা আমাকে বেশ ভাবিত করত। গা থেকে পাপড়ির মতো এত মরচে খসে পড়ছে আর ছোট ছোট গর্ত আর দাগ রেখে যাচ্ছে দেখে আমার ভয় হত, একদিন দেখব গোটা রোলারটাই না একদিন লাল লাল ধুলো আর ধাতুর চলটা ফেলে রেখে উবে যায়! আমি ভাবতাম ধাতুগুলো সবই ভারি সুস্থায়ী, সোনার মতো। তাদের ক্ষয় হয় না, তারা সময়ের থাবাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে।
আমি মাঝে মাঝে মায়ের এনগেজমেন্ট রিংটা আঙুল থেকে খুলে তার ভেতরকার হিরেটা দেখানোর জন্য বায়না ধরতাম মার কাছে। ওই হিরের চমকের মতো কিছু আমি আর কখনও দেখিনি। মনে হত যতটা আলো এদের ভেতরে ঢুকছে তার অনেক বেশি যেন এরা ফিরিয়ে দিচ্ছে। মা দেখাতেন হিরে কেমন অবলীলায় কাচের ওপর দাগ কাটতে পারে। কখনও হিরেটাকে আমার ঠোঁটে ছোঁয়াতে বলতেন। একটা
অদ্ভুত চমকে দেওয়া ঠান্ডা অনুভূতি পেতাম। ধাতুর গায়ে হাত দিলেও ঠান্ডা লাগে, কিন্তু এটা তো বরফশীতল! মা জানাতেন, হিরে তাপের খুব ভালো পরিবাহক, এর তাপ পরিবহন ক্ষমতা ধাতুদের থেকে বেশি, ঠোঁটে ছোয়ালেই হিরা সেখান থেকে নিমেষে তাপ শুষে নেয়। সে অনুভূতি জীবনে ভুলিনি। হীরাকে হাত দিয়ে ধরে বরফের টুকরোয় ঠেকাও, দেখবে মাখনের ভিতর ছুরি চালাবার মতো সেটা বরফের টুকরোটাকে কেটে দেবে, এটা মা আমাকে করে দেখিয়েছিলেন। মা আমাকে বলেন, হিরে হল কার্বনের রূপভেদ, শীতকালে আমরা ঘর গরম রাখার জন্য যে কয়লা পোড়াই সেটাও কার্বন। এটা আমার কাছে যেন, ছিল রুমাল হয়ে গেল বিড়ালের মতো। বড় বিস্ময় জাগে, কী করে কালো, চলটা ওঠা, অস্বচ্ছ কয়লা আমার মায়ের হাতের আংটির হিরের মতো কঠিন, স্বচ্ছ একটা মণি হয়ে উঠতে পারে?
আমি ভারি আলোকমুগ্ধ। বিশেষ করে শুক্রবার রাতে মা যখন
প্রার্থনাগীতি গুনগুন করতে করতে শাব্বাসের মোমবাতি জ্বালাতেন। এই আলো ছিল পবিত্রতার
প্রতীক। জ্বালানো হয়ে গেলে মা আমাকে তা ছুঁতেও দিতেন না। আমাকে বলা হত সে আলো
পবিত্র, দেবালয়ের পুণ্যদীপ, ওটা নাড়াঘাঁটা করার জিনিস না। মোমবাতির শিখার কেন্দ্রে
জ্বলে একটা নীলরঙা শঙ্কু। সেটার দিকে আমি সম্মোহিতের মতো চাইতাম, আমার কেবলই মনে হত,
ওটার রং নীল কেন? আমাদের বাড়িতে কয়লা জ্বালানো হত। আমি প্রায়ই ওই আগুনের একেবারে
ভেতরে চোখ রাখতাম, দেখতাম আগুনের বর্ণ আধফোটা লাল থেকে কমলা, তারপর হলুদ হত, আমি
তখন হাওয়া দেওয়ার হাঁপরটা দিয়ে হাওয়া দিতে থাকতাম, যতক্ষণ না আগুনের রঙ শ্বেত-তপ্ত
হয়ে ওঠে। আমি ভাবতাম, আরও গরম হলে কি এটা নীল ছটা ছড়াতে থাকবে, তখন সেটাকে কি নীল-তপ্ত
বলা যাবে?
সূর্য আর তারাতেও কি একই ভাবে আগুন জ্বলে? সেগুলো কখনও নিভে
যায় না কেন? এরা কী দিয়ে তৈরি? জানাঅজানার দোলায় দুলতে দুলতে একদিন জানলাম পৃথিবীর
অন্দরমহলে আছে সুবিশাল লোহার বল। শুনে মনে হল সেটা বেশ একটা ভারভারিক্কি ব্যাপার,
ওটার উপর ভরসা করা যায়। গায়ে আমার পুলক লাগত যখন জানলাম আমরা, সূর্য, তারারা একই
মৌল দিয়ে গঠিত, এমনকি আমার শরীরের কিছু কিছু পরমাণু হয়তো কোনো সুদূর তারায় বাসা বেঁধেছিল।
আবার শঙ্কাও হত। মনে হত আমার শরীরের এই পরমাণুগুলো যেন ধার করে আনা, যে কোনো দিন
তা বুঝি উড়ে চলে যাবে, যেমন যায় স্নান ঘরে রাখা ট্যালকম পাউডার।
আমি বাবা-মাকে প্রশ্নে প্রশ্নে উত্যক্ত করতাম। রং কোত্থেকে আসে? গ্যাস বার্নারের উপরের দিকে ঝুলিয়ে রাখা প্যাঁচানো প্লাটিনামের তার দিয়ে মা
গ্যাস বার্নার ধরায় কেন? চায়ের কাপে চিনি দিয়ে ঘাঁটবার পর সেটা কোথায় যায়? জল
ফুটলে জলে বুদবুদ হয় কেন? ( আমি স্টোভে জল ফোটা দেখতে ভালবাসতাম, কেমন করে জল
ফোটার আগে সেটা উত্তাপে কাঁপতে থাকে, তারপর ওঠে বুদবুদ, ফেটে যায়।)
মা আমাকে আরও অনেক অবাক-করা জিনিস দেখিয়েছেন। মায়ের একটা
ঝকঝকে হলদে রঙের অ্যাম্বারের পুঁতি দিয়ে বানানো নেকলেস ছিল, মা অ্যাম্বারটাকে যেই
ঘসতেন, ছোট ছোট কাগজের টুকরো লাফিয়ে উঠে অ্যাম্বারটার গায়ে আটকে যেত। মা আবার মাঝে
মাঝে ওই তড়িৎমাখা অ্যাম্বারের টুকরোটা আমার কানে ঠেকাতেন, মনে হত সেটা যেন কানে
কানে কিছু বলার সঙ্গে কানে চিমটিও কাটছে।
আমার বড় দুই ভাইয়ের নাম মার্কাস আর ডেভিড, তারা আমার থেকে
নয় আর দশ বছরের বড়। তাদের টেনেছিল চুম্বক। তারা আমাকে চুম্বকের কেরামতি দেখাত। কাগজের
উপর পাউডারের মতো লোহার গুঁড়ো রেখে নীচে চুম্বক ধরত। চুম্বকের মেরু থেকে চমৎকার
নকশার রূপ নিয়ে ছড়িয়ে থাকত লোহার গুঁড়োগুলো, আমার দেখে দেখে আশ মিটত না। মার্কাস
ব্যাখ্যা করে বলেছিল, এগুলোকে বলে চৌম্বক বলরেখা, তাতে অবশ্য আমার তেমন কিছু
জ্ঞানবৃদ্ধি হত না।
আমার দাদা মাইকেল আমাকে একটা ক্রিস্টাল রেডিও দিয়েছিল, আমি
সেটা বিছানায় নিয়ে শুনতাম। ক্রিস্টালের সঙ্গে জোড়া তারটাকে নিয়ে খুটখুট করতে করতে কোনো
না কোনো রেডিও ষ্টেশন ধরে ফেলতাম। আর ছিল ঘরভর্তি আলো-ঠিকরানো ঘড়ি, সেগুলোর মূলে আমার
মামা অ্যাবি। তি্নি ছিলেন আলো-জ্বলা রং বানানোর এক ওস্তাদ পথপ্রদর্শক। ক্রিস্টাল
রেডিওটার মতো এই ঘড়িগুলোকেও আমি রাতে চাদরের নীচে নিয়ে শুতাম। সেটা আমার চাদরে
তৈরি গোপন গুহাটাকে ভূতুড়ে সবুজ আলোয় ভরে দিত।
এই সব বস্তু
- ঘষা অ্যাম্বার, চুম্বক, ক্রিস্টাল রেডিও, ঘড়ির ডায়াল, আমার মনে যেন অদৃশ্য রশ্মি
আর অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্বের কথা জানান দিত। যেন মনে হত, যে জগৎটা চোখে দেখি, এই
রঙে আর চেনা অবয়বে ভরা জগৎটার তলায় রয়ে গেছে অদ্ভুত রীতিনীতির, বিচিত্র ঘটনা
ঘটানো, অন্ধকার আর গোপন এক মায়াজগৎ।
যখনই বাড়ি ‘ফিউজ হত’, বাবা রান্নাঘরের দেওয়ালে আটকানো
চিনেমাটির ফিউজবক্সের ভেতর থেকে গলে একটা ধাতুপিণ্ডে পরিণত হওয়া ফিউজটা বের করে সেখানে
লাগিয়ে দিতেন একটা বেখাপ্পা নরম তার। ধাতু গলার এই ঘটনাটা আমাকে ভাবাত – ধাতু কখনও
গলতে পারে? সত্যিই কি আমাদের
বাগানের রোলার বা টিনের ক্যানের ধাতুর মতো কোনো পদার্থ দিয়ে ওই ফিউজ তারটা তৈরি?
বাবা
বলেছিলেন, ফিউজ তারগুলো বিশেষ এক ধরনের সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি। টিন, সিসা আর আরও
কিছু ধাতু মিশিয়ে সেটা তৈরি করা হয়। এরা প্রত্যেকেই কম তাপে গলে, কিন্তু সংকর
ধাতুটা গলে তার থেকেও কম তাপে। এ কী করে হয়? নতুন
ধাতুটার কম তাপে গলে যাওয়ার গোপন রহস্যটাই বা কী?
ধরা যাক
বিদ্যুৎ, এটাই বা প্রবাহিত হয় কী করে? এটা কি তাপের মতো এক প্রবাহ? পরিবহন করা
যায়? তা হলে ধাতব তারের সঙ্গে সেটা প্রবাহের মতো আচরণ করে, চিনেমাটির সঙ্গে করে না
কেন? এই ধাঁধারও সমাধান চাই।
যে কোনো পদার্থ
নিয়ে আমার অনন্ত জিজ্ঞাসা, কিন্ত বার বার ঘুরেফিরে ধাতুর কথাই আমি তুলতাম। এরা
চকচকে কেন? এত মসৃণ কেন? ঠান্ডা কেন? কঠিন কেন? ভারী হয় কেন? মচকে যায় অথচ ভাঙে না
কেন? আঘাতে বোল তোলে কেন? জিঙ্ক আর তামা বা টিন আর তামা এই সব নরম ধাতুদের
মিশ্রণ কঠিন হয় কী করে? সোনাকে স্বর্ণাভ করল কে? এটাতে মরচে ধরে না কেন? আমার মা
খুব ধৈর্যশীলা, সব জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু পরিশেষে তাঁরও ধৈর্যের
বাঁধ ভেঙে যায়, বলেন, আমি যা জানি তোমাকে বলেছি, আরও জানতে হলে এবার ডেভ মামাকে
পাকড়াও করো।
আমার যতদূর মনে পড়ে, আমরা তাঁকে আঙ্কল টাংস্টেন বলে ডাকতাম। মামা বৈদ্যুতিক বাল্ব্ বানাতেন।খুব সূক্ষ্ম টাংস্টেন তার দিয়ে বাল্বের ফিলামেন্ট লাগাতেন। তাঁর কারখানার নাম ছিল টাংস্টালাইট। আমি প্রায়ই ফ্যারিংডনে তাঁর পুরনো কারখানায় যেতাম, দেখতাম ডানা-ওড়ানো কলারঅলা জামা গায়ে, আস্তিন গুটিয়ে, মামা কাজে ব্যস্ত। কালো, ভারী টাংস্টেনের পাউডারে চাপ দিয়ে জমিয়ে হাতুড়ি-পেটাই করে, তারপর গনগনে লাল আগুনে তাতিয়ে তা থেকে ফিলামেন্টের জন্য খুব সূক্ষ্ম তার বের করা হত। মামার হাত থাকত কালো পাউডারে মাখামাখি, শতধৌতেন সে ময়লা মুছবার নয়। (লোকেরা বলাবলি করত সে জন্য পুরো চামড়াটা গুটিয়ে তুলে নেওয়া দরকার, আর তাতেও ময়লা সবটা ঘুচে কি না সন্দেহ।) আমার ধারণা তিরিশ বছর ধরে টাংস্টেন ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে এই ভারী ধাতু মামার ফুসফুসে, হাড়ে, শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকেছে। আমি একে অভিশাপ না ভেবে আশীর্বাদ ভেবেছি, তাঁর শরীর বুঝি এই শক্তিমান ধাতুর প্রভাবেই সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি চনমনে, বেশি সহনশীল আর বলবান হয়েছিল।
![]() |
টাংস্টেন দণ্ড আর ঘনক |
আমি কারখানায় গেলে মামা নিজে অথবা তাঁর ফোরম্যানকে দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাকে কারখানা দেখাতেন। (ফোরম্যান মানুষটি ছিলেন আকারে ছোটখাটো কিন্তু পেশিবহুল, টাংস্টেন নিয়ে কাজ করার সুফলের জলজ্যান্ত উদাহরণ।)। কারখানার যন্ত্রগুলো আমাকে মোহিত করত। রীতিমতো উদ্ভাবনী শক্তির পরাকাষ্ঠা সেইসব যন্ত্র, পরিষ্কার চকচকে, তৈল নিষিক্ত। আর ছিল চুল্লি, যাতে গুঁড়ো গুঁড়ো রূপহীন টাংস্টেনকে তাপ ও চাপ দিয়ে চকচকে ধূসর বর্ণের দণ্ড বানানো হত, এগুলো দেখে দেখে কখনও ক্লান্ত হইনি।
আমি যখন কারখানায় যেতাম বা মাঝে মাঝে বাড়িতেও মামা ছোটখাটো
নানা পরীক্ষার মাধ্যমে ধাতু বিষয়ে নানা শিক্ষা দিতেন। পারদের কথা আমার জানা ছিল। এ
এক অদ্ভুত তরল ধাতু, আর কী ভারী এবং ঘন। সিসাও এর ভেতর ডোবে না, গামলাকৃতি পাত্রে
পারদ ঢেলে তার উপর সিসার বুলেট রেখে মামা আমায় দেখিয়েছিলেন। তারপর পকেট থেকে ধূসর রঙের
একটা দণ্ড বের করে পারদের গামলায় ছেড়ে দিলে , লাগ ভেলকি লাগ, দণ্ডটা ডুবে গেল। মামা
বললেন, এই হল আমার ধাতুর ধরন। এটা টাংস্টেন, আমার প্রিয় ধাতু ।
পারদ
মামার হৃদয় জুড়ে ছিল টাংস্টেন - ঘনত্ব, তার ভঙ্গুরতা, তার
রাসায়নিক স্থায়িত্ব। এই ধাতুতে তৈরি তার, পাউডার, বিশেষ করে পিণ্ড আর দণ্ডগুলো
নিয়ে শিশুর মতো ঘাঁটতে ভালবাসতেন। আদর করতেন, হাতের তালুতে (আমার মনে হত অতি পেলব ভাবে)
বসিয়ে ভারসাম্যের খেলা দেখাতেন। আমার হাতে টাংস্টেনের দণ্ড গুঁজে দিয়ে বলতেন,
দ্যাখো অলিভার দ্যাখো। কখনও বলতেন, আগুনে টাটানো টাংস্টেন বারের মতো পৃথিবীতে আর
কিছু নেই, বুঝলে! কখনও দণ্ডগুলোতে টোকা দিতেন আর তা থেকে ভারী শব্দ উঠত। মামা
বলতেন, এ হল টাংস্টেনের আওয়াজ। ডেভ মামা বলতেন, এমন শব্দ আর কোথাও হয় না। সত্যি কি
না জানি না, তবে আমি তা নিয়ে কখনও কোনো প্রশ্ন তুলিনি।
ছোটদের দলে আমি ছিলাম সবার ছোট ( চার ভাইবোনের মধ্যে আমি
সবথেকে ছোট, আমার মা ছিলেন আঠারোজন ভাইবোনের মধ্যে ষোলো নম্বর)। আমি মাতামহের
প্রায় একশো বছর পরে জন্মেছি, তাঁকে জানার সুযোগ হয়নি। ১৮৩৭ সালে রাশিয়ার একটি
ছোট্ট গ্রামে তাঁর জন্ম, নাম ছিল মরডেকাই ফ্রেডকিন। যৌবনে কসাক সৈন্যবাহিনীতে
যোগদানের প্রলোভন ত্যাগ করে, মাত্র ষোলো বছর বয়সে, ল্যানডাউ নামে এক মৃত ব্যক্তির
পাসপোর্ট ব্যবহার করে রাশিয়া ছেড়ে পালিয়ে আসেন। মারকাস ল্যানডাউ নাম নিয়ে প্রথমে
প্যারিস, তারপর ফ্রাঙ্কফুর্টে আসেন। সেখানেই তিনি বিয়ে করেন (কনের বয়সও তখন ষোলো)। তার দু বছর
পর, ১৮৫৫ সালে, তাঁরা ইংল্যান্ডে আসেন, সঙ্গে প্রথম সন্তান। সব দিক দিয়ে বিচার
করলে আমার মাতামহ পার্থিব ও আধ্যাত্মিক জগতের মাঝামাঝি বিচরণ করতেন। তিনি ছিলেন
একজন জুতা প্রস্তুতকারী, পরে মুদিখানা করেন, তিনি হিব্রুভাষা বিশেষজ্ঞ, অপেশাদার গণিতজ্ঞ
ও উদ্ভাবক। মুক্তচিন্তক। বাড়ির বেসমেন্ট থেকে ১৮৮৮ থেকে ১৮৯১ অবধি জিউয়িস স্ট্যান্ডার্ড নামে
একটা পত্রিকা প্রকাশ করতেন। নতুন আলোচিত বায়ুযানবিদ্যা নিয়ে তিনি কৌতূহলী ছিলেন,
এ ব্যাপারে রাইট ভাইদের সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্র চালাচালি হত। ১৯০০ সালে ওঁরা যখন
লন্ডন এসেছিলেন, তখন মাতামহের সঙ্গে তাঁরা সাক্ষাৎ করেন – এ ঘটনাটা কোনো কোনো
মামার স্মৃতিতে রয়েছে। আমার মামা-মাসিরা বলেন, মাতামহের জটিল অঙ্ক কষার নেশা ছিল,
স্নানপাত্রে শুয়ে শুয়ে মাথার ভিতরেই সমাধান করতেন। সব ছাপিয়ে তাঁর নেশা ছিল বাতি
উদ্ভাবনের পরীক্ষানিরীক্ষা - খনির সুরক্ষা বাতি, গাড়িতে লাগানো বাতি, রাস্তার বাতি
নিয়ে। ১৮৭০ সালে এই সব বাতির পেটেন্টও নিয়েছিলেন।
নানা বিষয়ে ছিলেন পারদর্শী, এবং নিজের চেষ্টায় শিক্ষিত
হয়েছিলেন। মাতামহ বিশেষ করে বিজ্ঞান শিক্ষার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন। তাঁর নয়
ছেলের সঙ্গে সমতা রেখে নয় মেয়েকেও শিক্ষিত করেছেন। হতে পারে তাঁর ওই মানসিকতা অথবা তাঁর
বিজ্ঞানের প্রতি ঐকান্তিক ভালবাসা, তাঁর নয় ছেলের মধ্যে সাত জনকেই অঙ্ক আর
বিজ্ঞানের আঙিনায় টেনে এনেছিল। মেয়েদের কিন্তু টেনেছিল এর বিপরীতে মানবিকবিদ্যার প্রাঙ্গণে।
তাঁরা বেছেছিলেন জীববিদ্যা, চিকিৎসা, শিক্ষা আর সমাজবিজ্ঞান। এঁদের মধ্যে দুজন
আবার ইস্কুল স্থাপন করেছিলেন, দুজন করেন শিক্ষকতা, আর আমার মাকে নিয়ে শিক্ষার দুই
ধারা – ভৌতবিজ্ঞান আর মানবিকবিদ্যার টাগ অফ ওয়ার চলেছিল। বালিকা বয়সে মাকে হাতছানি
দিত রসায়ন। (তাঁর বড় ভাই মিক সবে মাত্র রসায়নবিদ হয়েছে), কিন্তু পরে শারীরবিদ্যা
সহ সার্জন হন। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে তাঁর ভালবাসা, মুগ্ধতা চিরকাল ছিল। কোনো বিষয়ের বাখ্যা
দিতে কেবলমাত্র পল্লবগ্রাহিতা নয়, মূলেও চলে যেতে ভালবাসতেন। তাই আমার বাল্যকালের
জিজ্ঞাসু হাজার-একটা প্রশ্নের উত্তর দিতেন ধৈর্য ধরে, বিস্তারিত ভাবে বোঝাতেন। বুঝতে
পারতাম অনেক উত্তর আমার বোঝার সীমানার বাইরে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, তবুও মন্ত্রমুগ্ধের
মতো শুনতাম। প্রথম থেকেই যে-কোনো বিষয়ে আমার জানার ও অনুসন্ধান করার আগ্রহকে তিনি
উৎসাহিত করেছেন।
আমার মামা, কাকা, মাসি, পিসিদের সন্তানরা অর্থাৎ আমার
জ্ঞাতি ভাইবোনেরা গুনতিতে ছিল একশোর কাছাকাছি, অধিকাংশ পরিবারই লন্ডনকে কেন্দ্র
করে বসবাস করত, যদিও তাদের কিছু শাখাপ্রশাখা সূদুর আমেরিকা, ইউরোপের অন্যত্র, সাউথ
আফ্রিকাতেও পৌঁছেছিল। আমরা প্রায়ই পারিবারিক যে-কোনো অনুষ্ঠানে গোষ্ঠীগত ভাবে
মিলিত হতাম। আমার ভালো লাগত, ঝুরি নামানো সুবিশাল বটগাছের মতো আমাদের বিরাট
পরিবারের যে কোনো সদস্যের বিজ্ঞান বিষয়ে কৌতূহলী প্রশ্ন করার জন্মগত অধিকার ছিল। ইংরেজ বা
ইহুদি জাতের মতো আমরা যেন আর-একটা জাতি, আমরা হলাম প্রশ্নের জাতি। জ্ঞাতি ভাইবোনদের
এই দলে আমিই ছিলাম কনিষ্ঠতম। সাউথ আফ্রিকায় বাস করা জ্ঞাতিভাই আমার থেকে
পঁয়তাল্লিশ বছরের বড়, আমার অনেক জ্ঞাতিভাই তখন বৈজ্ঞানিক বা অঙ্কশাস্ত্রজ্ঞ পরিচয়ে
সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আমার সামান্য বড় দাদা-দিদিরা তখন বিজ্ঞানমুগ্ধতায় আপ্লুত। এক
জ্ঞাতিভাই পদার্থবিদ্যার শিক্ষক, আরও তিনজন বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন নিয়ে পড়ছে। আর
একজন পনেরো বছর বয়সের অকালপক্ব, অঙ্কশাস্ত্রে তুখোড়। কল্পনায় দেখি, অনেকদূরের
তারার অণু-পরমাণুর মতো সেই বুড়ো লোকটার অণু-পরমাণু আমাদের রক্তের ভিতরে খেলা করছে।
অনুবাদ: রণজিৎ দাশগুপ্ত
অলিভার স্যাকস একজন অতি-অতি-অতি জনপ্রিয় বিজ্ঞানলেখক। তিনি (১৯৩৩-২০১৫) অল্প কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু সেটা বিশ্বাস হয় না। পেশায় ছিলেন স্নায়ুতত্ত্ববিদ। Uncle Tungsten: Memories of a Chemical Boyhood তাঁর লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। সেই বইয়ের ‘আংকল টাংস্টেন’ নামক অধ্যায়টি এখানে অনূদিত হল।













