Friday, April 30, 2021

আমার টাংস্টেন মামা

 

 

আমার টাংস্টেন মামা

অলিভার স্যাকস

 


অলিভার স্যাকস (১৯৩৩-২০১৫)



আমার বাল্যস্মৃতির অনেকখানি জুড়ে আছে বিভিন্ন ধাতু মনে হয় আমার জীবনের গোড়া থেকেই যেন তারা প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল। বিশ্বজুড়ে পাঁচমেশালি হরেকরকমবা-র ভেতরেও তারা আলাদা তাদের আলো ঠিকরানো ঔজ্বল্য, রজতশুভ্র রূপ, মসৃণতা আর ওজনদার বৈশিষ্ট্যের কারণে। স্পর্শে আনে শীতল ভাব, টোকা দিলে ওঠে নিক্বণ।

সোনার হলুদাভ বর্ণ ও ভারী ওজন আমার খুব ভালো লাগে। আমার মা মাঝেসাঝে তাঁর হাতের আঙুলে থাকা বিয়ের আংটিটা খুলে নিয়ে আমাকে দেখতে দিতেন, বলতেন, সোনা অজর, অমর। এই ধাতু মলিনতা মুক্ত, সিসার থেকেও ভারী। ততদিনে আমার সিসার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কোন একবছরে জলকলের মিস্ত্রি একটা ভারী অথচ নরম পাইপ ফেলে গিয়েছিল, তার সুবাদে। মা বলতেন, সোনাও নরম। এর প্রকৃতি কঠিন করার জন্য এর সঙ্গে অন্য ধাতু মেশাতে হয়। তামাও একই রকম আচরণ করে, মানুষ এর সঙ্গে টিন মিশিয়ে ব্রোঞ্জ তৈরি করে। ব্রোঞ্জ! এই শব্দটাই আমার কানে যেন যুদ্ধের ভেরি বাজিয়ে দেয় - যুদ্ধ মানেই ব্রোঞ্জ বনাম ব্রোঞ্জ, ব্রোঞ্জের বল্লম ব্রোঞ্জের ঢালে সিধোঁতে চায়, ঢাল মানেই অ্যাকিলিসের দুর্ধর্ষ ঢাল। মা বলতেন, তুমি চাইলে তামা আর জিঙ্কের সংকর ধাতু, পেতলও বানাতে পারো। আমাদের প্রত্যেকের নামে একটা করে পেতলের মোমদানি ছিল – মায়ের, আমার ও আমার ভাইদের। সেগুলো হানুকা উৎসবে কাজে লাগে। (বাবারটা ছিল রুপোর।)

তামা আমি চিনতাম। আমাদের রান্নাঘরে ছিল গোলাপি-শুভ্র তামার ঢাউস কড়াই, যেটা বছরে একবার মর্তে অবতরণ করত যে সময় বাগানে ন্যাসপাতি আর ক্র্যাব অ্যাপল টুসটুসে হয়ে পেকে উঠত। আমার মা ওই কড়াইয়ে সেগুলো জ্বাল দিয়ে তাদের জেলিতে রূপান্তর ঘটাতেন।

জিঙ্কও আমার পরিচিত, আমাদের বাগানে ছিল ম্যাটমেটে নীলচে রঙের জিঙ্কে তৈরি পাখিদের স্নানপাত্র। আর টিন তো কাছেই ছিল, মোটা টিনের পাতে আমরা বনভোজনের স্যান্ডউয়িচ মোড়াতাম। আমার মা দেখাতেন জিঙ্ক বা টিনের পাতকে চাপ দিয়ে বাঁকালে সেগুলো কেমন ‘কান্নাকাটি’ করে। মা বলতেন সেগুলোর স্ফটিক-কাঠামো বদলে যাচ্ছে বলে ওরা কাঁদছে। মা ভুলেই যেতেন যে আমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর, তাঁর কথা আমার বোধগম্য হওয়ার মতো নয়, কিন্তু তাঁর উচ্চারিত শব্দগুলো আমাকে সম্মোহিত করে রাখত, আমি আরও জানতে চাইতাম।

আমাদের বাগানে ঢালাই লোহায় তৈরি একটা পেল্লায় লন রোলার ছিল, বাবা বলেছিলেন তার ওজন পাঁচশো পাউন্ড। আমরা ছেলেবেলায় সেটাকে নাড়াতেও পারতাম না। বাবার গায়ে খুব জোর ছিল, তিনি এটাকে মাটি থেকে তুলে ধরতে পারতেন। রোলারটা সব সময়েই মরচে-মলিন, এটা আমাকে বেশ ভাবিত করত। গা থেকে পাপড়ির মতো এত মরচে খসে পড়ছে আর ছোট ছোট গর্ত আর দাগ রেখে যাচ্ছে দেখে আমার ভয় হত, একদিন দেখব গোটা রোলারটাই না একদিন লাল লাল ধুলো আর ধাতুর চলটা ফেলে রেখে উবে যায়! আমি ভাবতাম ধাতুগুলো সবই ভারি সুস্থায়ী, সোনার মতো। তাদের ক্ষয় হয় না, তারা সময়ের থাবাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে।

আমি মাঝে মাঝে মায়ের এনগেজমেন্ট রিংটা আঙুল থেকে খুলে তার ভেতরকার হিরেটা দেখানোর জন্য বায়না ধরতাম মার কাছে। ওই হিরের চমকের মতো কিছু আমি আর কখনও দেখিনি। মনে হত যতটা আলো এদের ভেতরে ঢুকছে তার অনেক বেশি যেন এরা ফিরিয়ে দিচ্ছে। মা দেখাতেন হিরে কেমন অবলীলায় কাচের ওপর দাগ কাটতে পারে। কখনও হিরেটাকে আমার ঠোঁটে ছোঁয়াতে বলতেন। একটা

অদ্ভুত চমকে দেওয়া ঠান্ডা অনুভূতি পেতাম। ধাতুর গায়ে হাত দিলেও ঠান্ডা লাগে, কিন্তু এটা তো বরফশীতল! মা জানাতেন, হিরে তাপের খুব ভালো পরিবাহক, এর তাপ পরিবহন ক্ষমতা ধাতুদের থেকে বেশি, ঠোঁটে ছোয়ালেই হিরা সেখান থেকে নিমেষে তাপ শুষে নেয়। সে অনুভূতি জীবনে ভুলিনি। হীরাকে হাত দিয়ে ধরে বরফের টুকরোয় ঠেকাও, দেখবে মাখনের ভিতর ছুরি চালাবার মতো সেটা বরফের টুকরোটাকে কেটে দেবে, এটা মা আমাকে করে দেখিয়েছিলেন। মা আমাকে বলেন, হিরে হল কার্বনের রূপভেদ, শীতকালে আমরা ঘর গরম রাখার জন্য যে কয়লা পোড়াই সেটাও কার্বন। এটা আমার কাছে যেন, ছিল রুমাল হয়ে গেল বিড়ালের মতো। বড় বিস্ময় জাগে, কী করে কালো, চলটা ওঠা, অস্বচ্ছ কয়লা আমার মায়ের হাতের আংটির হিরের মতো কঠিন, স্বচ্ছ একটা মণি হয়ে উঠতে পারে?

আমি ভারি আলোকমুগ্ধ। বিশেষ করে শুক্রবার রাতে মা যখন প্রার্থনাগীতি গুনগুন করতে করতে শাব্বাসের মোমবাতি জ্বালাতেনএই আলো ছিল পবিত্রতার প্রতীক। জ্বালানো হয়ে গেলে মা আমাকে তা ছুঁতেও দিতেন না। আমাকে বলা হত সে আলো পবিত্র, দেবালয়ের পুণ্যদীপ, ওটা নাড়াঘাঁটা করার জিনিস না। মোমবাতির শিখার কেন্দ্রে জ্বলে একটা নীলরঙা শঙ্কু। সেটার দিকে আমি সম্মোহিতের মতো চাইতাম, আমার কেবলই মনে হত, ওটার রং নীল কেন? আমাদের বাড়িতে কয়লা জ্বালানো হত। আমি প্রায়ই ওই আগুনের একেবারে ভেতরে চোখ রাখতাম, দেখতাম আগুনের বর্ণ আধফোটা লাল থেকে কমলা, তারপর হলুদ হত, আমি তখন হাওয়া দেওয়ার হাঁপরটা দিয়ে হাওয়া দিতে থাকতাম, যতক্ষণ না আগুনের রঙ শ্বেত-তপ্ত হয়ে ওঠে আমি ভাবতাম, আরও গরম হলে কি এটা নীল ছটা ছড়াতে থাকবে, তখন সেটাকে কি নীল-তপ্ত বলা যাবে?

সূর্য আর তারাতেও কি একই ভাবে আগুন জ্বলে? সেগুলো কখনও নিভে যায় না কেন? এরা কী দিয়ে তৈরি? জানাঅজানার দোলায় দুলতে দুলতে একদিন জানলাম পৃথিবীর অন্দরমহলে আছে সুবিশাল লোহার বল। শুনে মনে হল সেটা বেশ একটা ভারভারিক্কি ব্যাপার, ওটার উপর ভরসা করা যায়। গায়ে আমার পুলক লাগত যখন জানলাম আমরা, সূর্য, তারারা একই মৌল দিয়ে গঠিত, এমনকি আমার শরীরের কিছু কিছু পরমাণু হয়তো কোনো সুদূর তারায় বাসা বেঁধেছিল। আবার শঙ্কাও হত। মনে হত আমার শরীরের এই পরমাণুগুলো যেন ধার করে আনা, যে কোনো দিন তা বুঝি উড়ে চলে যাবে, যেমন যায় স্নান ঘরে রাখা ট্যালকম পাউডার।

আমি বাবা-মাকে প্রশ্নে প্রশ্নে উত্যক্ত করতাম। রং কোত্থেকে আসে? গ্যাস বার্নারের উপরের দিকে ঝুলিয়ে রাখা প্যাঁচানো প্লাটিনামের তার দিয়ে মা গ্যাস বার্নার ধরায় কেন? চায়ের কাপে চিনি দিয়ে ঘাঁটবার পর সেটা কোথায় যায়? জল ফুটলে জলে বুদবুদ হয় কেন? ( আমি স্টোভে জল ফোটা দেখতে ভালবাসতাম, কেমন করে জল ফোটার আগে সেটা উত্তাপে কাঁপতে থাকে, তারপর ওঠে বুদবুদ, ফেটে যায়।)

মা আমাকে আরও অনেক অবাক-করা জিনিস দেখিয়েছেন। মায়ের একটা ঝকঝকে হলদে রঙের অ্যাম্বারের পুঁতি দিয়ে বানানো নেকলেস ছিল, মা অ্যাম্বারটাকে যেই ঘসতেন, ছোট ছোট কাগজের টুকরো লাফিয়ে উঠে অ্যাম্বারটার গায়ে আটকে যেত। মা আবার মাঝে মাঝে ওই তড়িৎমাখা অ্যাম্বারের টুকরোটা আমার কানে ঠেকাতেন, মনে হত সেটা যেন কানে কানে কিছু বলার সঙ্গে কানে চিমটিও কাটছে।

আমার বড় দুই ভাইয়ের নাম মার্কাস আর ডেভিড, তারা আমার থেকে নয় আর দশ বছরের বড়। তাদের টেনেছিল চুম্বক। তারা আমাকে চুম্বকের কেরামতি দেখাত। কাগজের উপর পাউডারের মতো লোহার গুঁড়ো রেখে নীচে চুম্বক ধরত। চুম্বকের মেরু থেকে চমৎকার নকশার রূপ নিয়ে ছড়িয়ে থাকত লোহার গুঁড়োগুলো, আমার দেখে দেখে আশ মিটত না। মার্কাস ব্যাখ্যা করে বলেছিল, এগুলোকে বলে চৌম্বক বলরেখা, তাতে অবশ্য আমার তেমন কিছু জ্ঞানবৃদ্ধি হত না।

আমার দাদা মাইকেল আমাকে একটা ক্রিস্টাল রেডিও দিয়েছিল, আমি সেটা বিছানায় নিয়ে শুনতাম। ক্রিস্টালের সঙ্গে জোড়া তারটাকে নিয়ে খুটখুট করতে করতে কোনো না কোনো রেডিও ষ্টেশন ধরে ফেলতাম। আর ছিল ঘরভর্তি আলো-ঠিকরানো ঘড়ি, সেগুলোর মূলে আমার মামা অ্যাবি। তি্নি ছিলেন আলো-জ্বলা রং বানানোর এক ওস্তাদ পথপ্রদর্শক। ক্রিস্টাল রেডিওটার মতো এই ঘড়িগুলোকেও আমি রাতে চাদরের নীচে নিয়ে শুতাম। সেটা আমার চাদরে তৈরি গোপন গুহাটাকে ভূতুড়ে সবুজ আলোয় ভরে দিত।

এই সব বস্তু - ঘষা অ্যাম্বার, চুম্বক, ক্রিস্টাল রেডিও, ঘড়ির ডায়াল, আমার মনে যেন অদৃশ্য রশ্মি আর অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্বের কথা জানান দিত। যেন মনে হত, যে জগৎটা চোখে দেখি, এই রঙে আর চেনা অবয়বে ভরা জগৎটার তলায় রয়ে গেছে অদ্ভুত রীতিনীতির, বিচিত্র ঘটনা ঘটানো, অন্ধকার আর গোপন এক মায়াজগৎ।

যখনই বাড়ি ‘ফিউজ হত’, বাবা রান্নাঘরের দেওয়ালে আটকানো চিনেমাটির ফিউজবক্সের ভেতর থেকে গলে একটা ধাতুপিণ্ডে পরিণত হওয়া ফিউজটা বের করে সেখানে লাগিয়ে দিতেন একটা বেখাপ্পা নরম তার। ধাতু গলার এই ঘটনাটা আমাকে ভাবাত – ধাতু কখনও গলতে পারে? সত্যিই কি আমাদের বাগানের রোলার বা টিনের ক্যানের ধাতুর মতো কোনো পদার্থ দিয়ে ওই ফিউজ তারটা তৈরি?

বাবা বলেছিলেন, ফিউজ তারগুলো বিশেষ এক ধরনের সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি। টিন, সিসা আর আরও কিছু ধাতু মিশিয়ে সেটা তৈরি করা হয়। এরা প্রত্যেকেই কম তাপে গলে, কিন্তু সংকর ধাতুটা গলে তার থেকেও কম তাপেএ কী করে হয়? নতুন ধাতুটার কম তাপে গলে যাওয়ার গোপন রহস্যটাই বা কী?

ধরা যাক বিদ্যুৎ, এটাই বা প্রবাহিত হয় কী করে? এটা কি তাপের মতো এক প্রবাহ? পরিবহন করা যায়? তা হলে ধাতব তারের সঙ্গে সেটা প্রবাহের মতো আচরণ করে, চিনেমাটির সঙ্গে করে না কেন? এই ধাঁধারও সমাধান চাই।

যে কোনো পদার্থ নিয়ে আমার অনন্ত জিজ্ঞাসা, কিন্ত বার বার ঘুরেফিরে ধাতুর কথাই আমি তুলতাম। এরা চকচকে কেন? এত মসৃণ কেন? ঠান্ডা কেন? কঠিন কেন? ভারী হয় কেন? মচকে যায় অথচ ভাঙে না কেন? আঘাতে বোল তোলে কেন? জিঙ্ক আর তামা বা টিন আর তামা এই সব নরম ধাতুদের মিশ্রণ কঠিন হয় কী করে? সোনাকে স্বর্ণাভ করল কে? এটাতে মরচে ধরে না কেন? আমার মা খুব ধৈর্যশীলা, সব জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু পরিশেষে তাঁরও ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়, বলেন, আমি যা জানি তোমাকে বলেছি, আরও জানতে হলে এবার ডেভ মামাকে পাকড়াও করো।

আমার যতদূর মনে পড়ে, আমরা তাঁকে আঙ্কল টাংস্টেন বলে ডাকতাম। মামা বৈদ্যুতিক বাল্‌ব্‌ বানাতেন।খুব সূক্ষ্ম টাংস্টেন তার দিয়ে বাল্‌বের ফিলামেন্ট লাগাতেন তাঁর কারখানার নাম ছিল টাংস্টালাইট। আমি প্রায়ই ফ্যারিংডনে তাঁর পুরনো কারখানায় যেতাম, দেখতাম ডানা-ওড়ানো কলারঅলা জামা গায়ে, আস্তিন গুটিয়ে, মামা কাজে ব্যস্ত। কালো, ভারী টাংস্টেনের পাউডারে চাপ দিয়ে জমিয়ে হাতুড়ি-পেটাই করে, তারপর গনগনে লাল আগুনে তাতিয়ে তা থেকে ফিলামেন্টের জন্য খুব সূক্ষ্ম তার বের করা হত। মামার হাত থাকত কালো পাউডারে মাখামাখি, শতধৌতেন সে ময়লা মুছবার নয়। (লোকেরা বলাবলি করত সে জন্য পুরো চামড়াটা গুটিয়ে তুলে নেওয়া দরকার, আর তাতেও ময়লা সবটা ঘুচে কি না সন্দেহ।) আমার ধারণা তিরিশ বছর ধরে টাংস্টেন ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে এই ভারী ধাতু মামার ফুসফুসে, হাড়ে, শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকেছে। আমি একে অভিশাপ না ভেবে আশীর্বাদ ভেবেছি, তাঁর শরীর বুঝি এই শক্তিমান ধাতুর প্রভাবেই সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি চনমনে, বেশি সহনশীল আর বলবান হয়েছিল।

টাংস্টেন দণ্ড আর ঘনক

আমি কারখানায় গেলে মামা নিজে অথবা তাঁর ফোরম্যানকে দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাকে কারখানা দেখাতেন। (ফোরম্যান মানুষটি ছিলেন আকারে ছোটখাটো কিন্তু পেশিবহুল, টাংস্টেন নিয়ে কাজ করার সুফলের জলজ্যান্ত উদাহরণ।) কারখানার যন্ত্রগুলো আমাকে মোহিত করত। রীতিমতো উদ্ভাবনী শক্তির পরাকাষ্ঠা সেইসব যন্ত্র, পরিষ্কার চকচকে, তৈল নিষিক্ত। আর ছিল চুল্লি, যাতে গুঁড়ো গুঁড়ো রূপহীন টাংস্টেনকে তাপ ও চাপ দিয়ে চকচকে ধূসর বর্ণের দণ্ড বানানো হত, এগুলো দেখে দেখে কখনও ক্লান্ত হইনি। 


পারদ
আমি যখন কারখানায় যেতাম বা মাঝে মাঝে বাড়িতেও মামা ছোটখাটো নানা পরীক্ষার মাধ্যমে ধাতু বিষয়ে নানা শিক্ষা দিতেন। পারদের কথা আমার জানা ছিল। এ এক অদ্ভুত তরল ধাতু, আর কী ভারী এবং ঘন। সিসাও এর ভেতর ডোবে না, গামলাকৃতি পাত্রে পারদ ঢেলে তার উপর সিসার বুলেট রেখে মামা আমায় দেখিয়েছিলেন। তারপর পকেট থেকে ধূসর রঙের একটা দণ্ড বের করে পারদের গামলায় ছেড়ে দিলে , লাগ ভেলকি লাগ, দণ্ডটা ডুবে গেল। মামা বললেন, এই হল আমার ধাতুর ধরন। এটা টাংস্টেন, আমার প্রিয় ধাতু

মামার হৃদয় জুড়ে ছিল টাংস্টেন - ঘনত্ব, তার ভঙ্গুরতা, তার রাসায়নিক স্থায়িত্ব। এই ধাতুতে তৈরি তার, পাউডার, বিশেষ করে পিণ্ড আর দণ্ডগুলো নিয়ে শিশুর মতো ঘাঁটতে ভালবাসতেনআদর করতেন, হাতের তালুতে (আমার মনে হত অতি পেলব ভাবে) বসিয়ে ভারসাম্যের খেলা দেখাতেন। আমার হাতে টাংস্টেনের দণ্ড গুঁজে দিয়ে বলতেন, দ্যাখো অলিভার দ্যাখো। কখনও বলতেন, আগুনে টাটানো টাংস্টেন বারের মতো পৃথিবীতে আর কিছু নেই, বুঝলে! কখনও দণ্ডগুলোতে টোকা দিতেন আর তা থেকে ভারী শব্দ উঠত। মামা বলতেন, এ হল টাংস্টেনের আওয়াজ। ডেভ মামা বলতেন, এমন শব্দ আর কোথাও হয় না। সত্যি কি না জানি না, তবে আমি তা নিয়ে কখনও কোনো প্রশ্ন তুলিনি।

ছোটদের দলে আমি ছিলাম সবার ছোট ( চার ভাইবোনের মধ্যে আমি সবথেকে ছোট, আমার মা ছিলেন আঠারোজন ভাইবোনের মধ্যে ষোলো নম্বর)। আমি মাতামহের প্রায় একশো বছর পরে জন্মেছি, তাঁকে জানার সুযোগ হয়নি। ১৮৩৭ সালে রাশিয়ার একটি ছোট্ট গ্রামে তাঁর জন্ম, নাম ছিল মরডেকাই ফ্রেডকিন। যৌবনে কসাক সৈন্যবাহিনীতে যোগদানের প্রলোভন ত্যাগ করে, মাত্র ষোলো বছর বয়সে, ল্যানডাউ নামে এক মৃত ব্যক্তির পাসপোর্ট ব্যবহার করে রাশিয়া ছেড়ে পালিয়ে আসেন। মারকাস ল্যানডাউ নাম নিয়ে প্রথমে প্যারিস, তারপর ফ্রাঙ্কফুর্টে আসেন। সেখানেই তিনি বিয়ে করেন (কনের বয়সও তখন ষোলো)তার দু বছর পর, ১৮৫৫ সালে, তাঁরা ইংল্যান্ডে আসেন, সঙ্গে প্রথম সন্তান। সব দিক দিয়ে বিচার করলে আমার মাতামহ পার্থিব ও আধ্যাত্মিক জগতের মাঝামাঝি বিচরণ করতেন। তিনি ছিলেন একজন জুতা প্রস্তুতকারী, পরে মুদিখানা করেন, তিনি হিব্রুভাষা বিশেষজ্ঞ, অপেশাদার গণিতজ্ঞ ও উদ্ভাবক মুক্তচিন্তক। বাড়ির বেসমেন্ট থেকে ১৮৮৮ থেকে ১৮৯১ অবধি জিউয়িস স্ট্যান্ডার্ড নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ করতেন নতুন আলোচিত বায়ুযানবিদ্যা নিয়ে তিনি কৌতূহলী ছিলেন, এ ব্যাপারে রাইট ভাইদের সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্র চালাচালি হত। ১৯০০ সালে ওঁরা যখন লন্ডন এসেছিলেন, তখন মাতামহের সঙ্গে তাঁরা সাক্ষাৎ করেন – এ ঘটনাটা কোনো কোনো মামার স্মৃতিতে রয়েছে। আমার মামা-মাসিরা বলেন, মাতামহের জটিল অঙ্ক কষার নেশা ছিল, স্নানপাত্রে শুয়ে শুয়ে মাথার ভিতরেই সমাধান করতেন। সব ছাপিয়ে তাঁর নেশা ছিল বাতি উদ্ভাবনের পরীক্ষানিরীক্ষা - খনির সুরক্ষা বাতি, গাড়িতে লাগানো বাতি, রাস্তার বাতি নিয়ে। ১৮৭০ সালে এই সব বাতির পেটেন্টও নিয়েছিলেন।

নানা বিষয়ে ছিলেন পারদর্শী, এবং নিজের চেষ্টায় শিক্ষিত হয়েছিলেন। মাতামহ বিশেষ করে বিজ্ঞান শিক্ষার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন। তাঁর নয় ছেলের সঙ্গে সমতা রেখে নয় মেয়েকেও শিক্ষিত করেছেন। হতে পারে তাঁর ওই মানসিকতা অথবা তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি ঐকান্তিক ভালবাসা, তাঁর নয় ছেলের মধ্যে সাত জনকেই অঙ্ক আর বিজ্ঞানের আঙিনায় টেনে এনেছিল। মেয়েদের কিন্তু টেনেছিল এর বিপরীতে মানবিকবিদ্যার প্রাঙ্গণে। তাঁরা বেছেছিলেন জীববিদ্যা, চিকিৎসা, শিক্ষা আর সমাজবিজ্ঞান। এঁদের মধ্যে দুজন আবার ইস্কুল স্থাপন করেছিলেন, দুজন করেন শিক্ষকতা, আর আমার মাকে নিয়ে শিক্ষার দুই ধারা – ভৌতবিজ্ঞান আর মানবিকবিদ্যার টাগ অফ ওয়ার চলেছিল। বালিকা বয়সে মাকে হাতছানি দিত রসায়ন। (তাঁর বড় ভাই মিক সবে মাত্র রসায়নবিদ হয়েছে), কিন্তু পরে শারীরবিদ্যা সহ সার্জন হন। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে তাঁর ভালবাসা, মুগ্ধতা চিরকাল ছিল। কোনো বিষয়ের বাখ্যা দিতে কেবলমাত্র পল্লবগ্রাহিতা নয়, মূলেও চলে যেতে ভালবাসতেন। তাই আমার বাল্যকালের জিজ্ঞাসু হাজার-একটা প্রশ্নের উত্তর দিতেন ধৈর্য ধরে, বিস্তারিত ভাবে বোঝাতেন। বুঝতে পারতাম অনেক উত্তর আমার বোঝার সীমানার বাইরে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, তবুও মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম। প্রথম থেকেই যে-কোনো বিষয়ে আমার জানার ও অনুসন্ধান করার আগ্রহকে তিনি উৎসাহিত করেছেন।

আমার মামা, কাকা, মাসি, পিসিদের সন্তানরা অর্থাৎ আমার জ্ঞাতি ভাইবোনেরা গুনতিতে ছিল একশোর কাছাকাছি, অধিকাংশ পরিবারই লন্ডনকে কেন্দ্র করে বসবাস করত, যদিও তাদের কিছু শাখাপ্রশাখা সূদুর আমেরিকা, ইউরোপের অন্যত্র, সাউথ আফ্রিকাতেও পৌঁছেছিল। আমরা প্রায়ই পারিবারিক যে-কোনো অনুষ্ঠানে গোষ্ঠীগত ভাবে মিলিত হতাম। আমার ভালো লাগত, ঝুরি নামানো সুবিশাল বটগাছের মতো আমাদের বিরাট পরিবারের যে কোনো সদস্যের বিজ্ঞান বিষয়ে কৌতূহলী প্রশ্ন করার জন্মগত অধিকার ছিলইংরেজ বা ইহুদি জাতের মতো আমরা যেন আর-একটা জাতি, আমরা হলাম প্রশ্নের জাতি জ্ঞাতি ভাইবোনদের এই দলে আমিই ছিলাম কনিষ্ঠতম। সাউথ আফ্রিকায় বাস করা জ্ঞাতিভাই আমার থেকে পঁয়তাল্লিশ বছরের বড়, আমার অনেক জ্ঞাতিভাই তখন বৈজ্ঞানিক বা অঙ্কশাস্ত্রজ্ঞ পরিচয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আমার সামান্য বড় দাদা-দিদিরা তখন বিজ্ঞানমুগ্ধতায় আপ্লুত। এক জ্ঞাতিভাই পদার্থবিদ্যার শিক্ষক, আরও তিনজন বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন নিয়ে পড়ছে। আর একজন পনেরো বছর বয়সের অকালপক্ব, অঙ্কশাস্ত্রে তুখোড়। কল্পনায় দেখি, অনেকদূরের তারার অণু-পরমাণুর মতো সেই বুড়ো লোকটার অণু-পরমাণু আমাদের রক্তের ভিতরে খেলা করছে।

 

অনুবাদ: রণজিৎ দাশগুপ্ত

 

অলিভার স্যাকস একজন অতি-অতি-অতি জনপ্রিয় বিজ্ঞানলেখক। তিনি (১৯৩৩-২০১৫) অল্প কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু সেটা বিশ্বাস হয় না। পেশায় ছিলেন স্নায়ুতত্ত্ববিদ। Uncle Tungsten: Memories of a Chemical Boyhood তাঁর লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। সেই বইয়ের ‘আংকল টাংস্টেন’ নামক অধ্যায়টি এখানে অনূদিত হল।

 

 

 

 

 

ছন্দে ছন্দে মিলি আনন্দে

  


ছন্দে ছন্দে মিলি আনন্দে

জোনাটন পেনিয়া রামিরেজ ও হেংক নেইমাইয়ের


একই বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসে থাকা দুটো পেন্ডুলাম নিজেদের মধ্যে কী গল্প করে?




এই উদাহরণগুলো দেখুন: সুরলহরীর সঙ্গে দেহলহরীর নিপুণ সমন্বয়ে ব্যালে নর্তকীদের যৌথ নৃত্য, সমবেত যন্ত্রসংগীতে সুরে সুরে সুর মিলিয়ে বেহালার ছড়ের টান, সমুদ্রে এক ঝাঁক মাছের সুসংবদ্ধ মায়াবী সন্তরণ।  

এগুলো এক কথায় সিংক্রোনাইজেশনের উদাহরণ। দুই বা তার বেশি ঘটনার ছন্দ তাল যতি মেলানো চলন। অবশ্যই প্রকৃতিতে এ এক অতি সুলভ ঘটনা। চেতন অচেতন যে কোনো বস্তু, এমনকি মানুষের ব্যবহারেও এর প্রকাশ দেখি। অলিম্পিক প্রতিযোগিতার এক-একটা ইভেন্টই সৃষ্টি হয়েছে এ নিয়ে - উঁচু থেকে সমলয়ে জলে ঝাঁপানো, অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় সিংক্রোনাইজড সাঁতার ইত্যাদিআমাদের জীবনও এর কাছে কৃতজ্ঞ, যেমন আমাদের হৃদকমলের ছন্দোময় স্পন্দন। হৃদযন্ত্রে তড়িৎস্পন্দন পাঠানো কোষদের তাল-মেলানো তড়িৎমোক্ষণের ওপরেই আমাদের হৃদয়ের সুস্থির চলন নির্ভরশীল।

পদার্থবিদ্যার জগতে জড় পদার্থের মধ্যেও এই ‘ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে’র ঘটনা বেশ রহস্যময়। সংগীতজ্ঞরা গানের তাল ঠিকঠাক রাখার জন্য যে যন্ত্র ব্যবহার করেন তার নাম মেট্রোনোম, দোকানে যেসব ধাতুর ক্যানে ভরে পানীয় বিক্রি হয় অমন দুটো খালি ক্যান নিয়ে তার উপরে একটা কাঠের পাটা চাপিয়ে তার উপর যদি দুটো আলাদা তালবিশিষ্ট মেট্রোনোম রাখা যায় তো দেখা যাবে কয়েক মিনিট, এমনকি কয়েক সেকেন্ডের ভিতর তাদের ছন্দ একরকম হয়ে যাচ্ছে দুটো মেট্রোনোম কী করে একই তালে চলার ‘সিদ্ধান্ত’ নিতে পারে? আর সবথেকে বড় ধাঁধা, কেনই বা তারা এমনটা করতে যাবে?

এই সব প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে আমাদের সময়ের হাত ধরে পিছিয়ে যেতে হবে সপ্তদশ শতকে, ক্রিশ্চিয়ান হয়গেনসের আমলে। হয়গেন্স সম্ভবত সর্বকালের সেরা ওলন্দাজ বিজ্ঞানী জ্যোতির্বিদ্যা ও আলোকবিজ্ঞানের প্রতি আসক্তি ছাড়াও অঙ্কে তাঁর তুখোড় পাণ্ডিত্য ছিল। ১৬৭৩ সালে তাঁর লেখা Holorogium Oscillatoratium, তাঁর জমানায় সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানগ্রন্থ, আইজ্যাক নিউটনের মতে তিনি ছিলেন ‘আধুনিক যুগের সবথেকে অন্যতম অনবদ্য লেখক’


ক্রিশ্চিয়ান হয়গেন্স (১৬২৯-১৬৯৫)

হয়গেন্স আবার অনেক জিনিসের উদ্ভাবকও বটে, তার মধ্যে একটি হল পেন্ডুলাম ঘড়ি তিনি ভেবেছিলেন এটাকে অবলম্বন করেই তদানীন্তন বড় বড় বৈজ্ঞানিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব। বর্তমানে আমাদের কাছে এটা হয়তো কোনও সমস্যাই নয়, কিন্তু সেই সময়কার নাবিকদের কথা ভাবুন, মাঝসমুদ্রে ভাসতে ভাসতে যাদের নিজেদের অবস্থানের অক্ষাংশ বের করতে হত দিগন্তরেখার উপরে সূর্যের অবস্থানের কৌণিক উচ্চতা আর তার রশ্মি বিষুবরেখার সঙ্গে কত ডিগ্রি কোণ করে রয়েছে তা পরিমাপের মাধ্যমে। কিন্তু এভাবে অক্ষাংশ জানা গেলেও দ্রাঘিমাংশ জানার জন্য, অর্থাৎ সমুদ্রে কতটা পূর্বে বা পশ্চিমে তারা অবস্থান করছে তা জানার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য অবলম্বন তাদের হাতে ছিল না।

হয়গেন্স যেমন 
পেন্ডুলাম ঘড়ি
উদ্ভাবন করেছিলেন

‘দ্রাঘিমা সমস্যা’র সমাধান করার জন্য যেসব উপায় চালু ছিল তার বেশিরভাগই নির্ভর করত সমুদ্রে জাহাজ যেখানে আছে সেখানকার স্থানীয় সময়ের সঙ্গে যে সময়ে বন্দর থেকে জাহাজটি রওনা দিয়েছিল তার স্থানীয় সময় অর্থাৎ ‘রেফারেন্স’ টাইমের ফারাক বের করার ওপর। এই দুই সময়ের অন্তরই দ্রাঘিমাংশ জানার চাবিকাঠি। হয়গেনস দেখাতে চেয়েছিলেন যে, তাঁর উদ্ভাবিত পেন্ডুলাম ঘড়ি সঠিক আর নির্ভরযোগ্য ভাবে ওই রেফারেন্স সময় বের করতে পারবে। তাঁর এই পেন্ডুলাম ঘড়ি সঠিক সময় দেবে কিনা দেখার জন্য ১৬৬৪ সালে হয়গেনস আলেকজান্ডার ব্রুস নামে এক ব্যক্তিকে সহযোগী হিসেবে নিয়ে একটা দুঃসাহসিক পরীক্ষা করলেনএই ঘটনার অল্পদিন আগেই লন্ডনে রয়্যাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছেন বারোজন বিজ্ঞানী, ব্রুস ছিলেন তাঁদের একজন।

তাঁদের ভাবনাটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য হয়গেনস ও ব্রুস, ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল রবার্ট হোমস-এর পরিচালনাধীন এক জাহাজে দুটো পেন্ডুলাম বসিয়েছিলেনদুটো ঘড়ি বসানোর কারণ ছিল, একটা যদি উত্তাল সমুদ্রের দাপাদাপিতে থেমেও যায়, অপরটি তবু হয়তো সঠিক ছন্দ রেখে দুলতে থাকবে

দ্রাঘিমা মাপার কাজটা হয়গেনস নাবিকদের বুঝিয়েছিলেন এইভাবে: যাত্রা শুরুর বন্দরটির সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে বাঁধা ঘড়িটাতে কটা বাজে সেটা প্রথমে জানো, এবং একইসঙ্গে সূর্যের অবস্থানের সাহায্যে জাহাজ যেখানে আছে তার স্থানীয় সময় নির্ণয় করো। যদি ঘড়িতে দেখানো সময়, জাহাজের অবস্থানের স্থানীয় সময়ের থেকে পিছিয়ে থাকে, তবে বুঝতে হবে জাহাজটি পূর্ব দিকে চলেছে, আর যদি এগিয়ে থাকে, তবে বুঝতে হবে পশ্চিমদিকে যাচ্ছেউভয়ক্ষেত্রেই প্রতি ঘণ্টা সময়ের পার্থক্য ১৫ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশের পার্থক্যকে বোঝাবে

পশ্চিম আফ্রিকার গিনি উপকূলের সেন্ট টমাস দ্বীপ থেকে যাত্রা শুরু করে হোমসের জাহাজটি প্রথমে পশ্চিম দিকে যাচ্ছিলকিন্তু কিছুদিন এইভাবে চলার পর জাহাজের হেঁসেলের প্রধানের মনে হল, পানীয় জলের সংকট দেখা দিচ্ছে। পেন্ডুলামে দেখানো সময় থেকে হোমস হিসেব করে বুঝতে পারলেন, জাহাজটি তখন মধ্য আটলান্টিকে অবস্থিত কেপ ভারডে দ্বীপপুঞ্জ থেকে মাত্র ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে রয়েছে পেন্ডুলাম ঘড়ি থেকে পাওয়া সময়ের সৌজন্যে হোমস তাঁর জাহাজের অভিমুখ ওই দ্বীপের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন, এবং ঘড়ির তথ্য যা ইঙ্গিত করছিল সেই অনুযায়ী তাঁরা পরের দিন সকালে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছলেন

হয়গেনস যতটা বিজ্ঞানী, ততটাই ছিল তাঁর ব্যবসাবুদ্ধি। প্রথম পরীক্ষার সফলতার পর তিনি তাঁর এই উদ্ভাবনী পেন্ডুলাম তৈরি করে বিক্রির ব্যবসাও শুরু করে দিলেন। এর সাহায্যে কীভাবে দ্রাঘিমাংশ মাপতে হবে সেই নির্দেশাবলীও ছেপে প্রকাশ করা হল। কিন্তু তাঁর পদ্ধতিতে একটা ত্রুটি থেকেই যাচ্ছিল, সেটা হল হুবহু একজোড়া পেন্ডুলাম বানানো সম্ভব নয় তার ফলে একটি পেন্ডুলাম ঘড়িতে যে সময় দেখায় তা অপর ঘড়ির সময় থেকে এগিয়ে বা পিছিয়ে থাকে। এখন ধরা যাক, সামুদ্রিক ঝড়ের অভিঘাতে একটির দোলন থেমে গেল, তখন নাবিকেরা অপরটি দিয়ে বন্ধ হওয়া পেন্ডুলাম ঘড়ির সময় রাখতে থাকল, তাহলে এই ঘড়িতে দেখানো সময় কিন্তু আগের ঘড়ির সময়ের কিছুটা হলেও আগুপিছু হবে, ফলে ভুল দ্রাঘিমাংশ নির্দেশ করবে। মাত্র চার মিনিট সময়ের ব্যবধানে ১ ডিগ্রির পার্থক্য হয়, ফলে বিপদের সম্ভাবনা খুব কম নয়।

দ্রাঘিমা সমস্যার সমাধান করার চেষ্টায় নেমে হয়গেনস একটি বিষয় লক্ষ করে অবাক হয়ে যান। দুটো ভিন্ন দোলনকালে চলা পেন্ডুলাম নিয়ে একটি সাধারণ অবলম্বন অর্থাৎ একটা কাঠের টুকরোয় ঝুলিয়ে, সেই কাঠের টুকরোটা দুটো চেয়ারের মাঝে বসিয়ে রাখলে দেখা যায়, আধ ঘণ্টা পরে তারা উল্টো অভিমুখে, কিন্তু একই দোলনকাল নিয়ে দুলছে। ১৬৬৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি একটি চিঠিতে তিনি এই ঘটনার কথা লিখে জানিয়েছিলেন বেলজিয়ান অঙ্কশাস্ত্রজ্ঞ, রনে ফ্রাঁসোয়া দে স্লুস-কে। হয়গেন্স এই অদ্ভুত ঘটনাটার নাম দেন ‘দুটি ঘড়ির সহমর্মিতা’, ‘দ্য সিমপ্যাথি অফ টু ক্লকস’

এর মজাটা হল এই যে, একটা ঘড়ি যদি বন্ধও হয়ে যায়, তবু অপরটা সেই দোলনকাল রক্ষা করেই চলবে, ফলে দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়ে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। ১৬৬৭ সালে হয়গেনস দ্বিতীয়বার এক সামুদ্রিক পরীক্ষা সাজালেন। জোটবদ্ধ পেন্ডুলাম ঘড়ির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করার বাসনা নিয়ে সেগুলো চাপালেন ওয়েস্ট ইন্ডিজগামী এক জাহাজে। ভাগ্যের অসহযোগিতায় সমুদ্রে ঝড় উঠল, পেন্ডুলাম ঘড়ি দুটি বন্ধ হয়ে গেল, সেগুলোর দেখভাল যেসব নাবিকের কাজ ছিল তারা নির্দেশনামা পড়েও সেগুলোকে ফের সচল করতে পারল না। সুতরাং সেগুলো দিয়ে সময় নির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ল


Ships in a Storm on a Rocky Coast
 by Jan Porcellis. Oil on canvas, 1614-1618, Hallwyl Museum.
(উইকিমিডিয়ার সৌজন্যে)

হয়গেনস বুঝতে পারলেন, উত্তাল সমুদ্রে পেন্ডুলাম ঘড়ির সাহায্যে দ্রাঘিমাংশ জানার সমস্যার সমাধান করা যাবে না, এতে ব্যবহারিক কিছু অসুবিধা রয়েছে। তাই ১৬৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি ওলন্দাজ অঙ্কবিশারদ, বার্নার্ড ফুলেনিয়াসকে একটি চিঠিতে লিখলেন, তিনি এ প্রকল্পে কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না’’ শেষ অবধি এর এক শতক পর, ইংল্যান্ডনিবাসী ঘড়ির কারিগর জন হ্যারিসন দ্রাঘিমাংশ সমস্যার সফল সমাধান করেছিলেন।

কিন্তু ‘হয়গেন্স সমলয়’-এর রহস্যটা রয়েই গেল, ওই নামে পরিচিতি পেয়েছিল হয়গেন্সের পর্যবেক্ষণটা। ১৭৪০ সালের আগে অবধি এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ওই বছরেই ইংল্যান্ডনিবাসী প্রখ্যাত ঘড়ি প্রস্তুতকারক জন এলিকট রয়্যাল সোসাইটিতে একটি পাণ্ডুলিপি জমা দেন। পাণ্ডুলিপিটির বিষয়বস্তু একটি অদ্ভুতুড়ে ঘটনা দুটি পেন্ডুলাম ঘড়িকে পাশাপাশি রেখে চালিয়ে দেওয়া হল, সেগুলো বসানো এমনভাবে যাতে তারা একই তলে দোদুল্যমান হয়। দেখা গেল এদের মধ্যে একটি প্রায় দু ঘণ্টা চলার পর বন্ধ হয়ে গেলেও অপরটি দুলতেই থাকে এলিকটের ধারণা হয়েছিল যে, যে-সাধারণ কাঠামোর সঙ্গে পেন্ডুলাম দুটো বসানো হয়েছিল তার মাধ্যমে তারা হয়তো একে অপরটির ওপর প্রভাব ফেলছে

এর পর ১৮৭৩ সালের আগে এই সমলয় ধাঁধায় আর কারও হাত দেওয়ার খবর মেলে না। ওই বছর ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ ও আবহাওয়াবিদ উইলিয়াম এলিস, গ্রিনিচের রয়্যাল অবজারভেটরিতে কাজ করার সময় লক্ষ করেন, একটা কাঠের ফ্রেমে দুটো পেন্ডুলাম ঘড়িকে ঝুলিয়ে দেওয়ার ৯ দিন পরেও তারা ঘড়িতে একই সময় নির্দেশ করছে এবং একই দোলনকাল নিয়ে বিপরীত গতিতে অর্থাৎ একটার অভিমুখ ডান দিকে হলে অপরটি বাঁ দিকে গতিশীল হয়ে দুলছে, যেমনটা হয়গেন্সের পরীক্ষায় পাওয়া গিয়েছিল।

এলিস তাঁর পরীক্ষার ফলাফল মান্থলি নোটিশেস অফ দি রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি-তে (৩৩ বর্ষ ৪৮০ সংখ্যায়) প্রকাশ করেন। সেখানে তিনিও ভিন্ন দশায় চলা পেন্ডুলামের ঘটনাকে ‘সমানুভূতি’ – ‘সিমপ্যাথি’ আখ্যা দেন অথচ তাঁর বা এলিকট কারও লেখাতেই হয়গেন্সের করা আগের পরীক্ষাগুলোর উল্লেখ নেই। সত্যি বলতে কী হয়গেন্সের জোড়া পেন্ডুলামের সমলয় দোলন সমস্যার প্রথম একটা প্রথামাফিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ডাচ অঙ্কজ্ঞ ডাইডেরিক কোর্টেভেগ (Diederik Korteweg), মাত্রই ১৯০৬ সালে তার পরে ফের বিরতি। একেবারে ১৯৮০ সালে এসে এ ব্যাপারে কিছুটা অগ্রগতির খবর আসে সোভিয়েট ইউনিয়ন থেকে। তদানীন্তন লেনিনগ্রাড শহরের মেখানোবর ইনস্টিটিউটে কর্মরত ইলিয়া ইজরায়েলেভিচ ব্লেখম্যান, হয়গেন্সের পরীক্ষাটার পুনরাবৃত্তি করলেন দুটো ছোট পেন্ডুলাম নিয়ে একই দেওয়ালের ওপর বসিয়ে। কোর্টেভেগ যেভাবে সমস্যাটার গাণিতিক সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন ব্লেখম্যান তার সঙ্গে কিছু নতুন পদ যোগ করলেন, সেগুলো পেন্ডুলামের দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির উৎসের সঙ্গে সম্পর্কিত।


হয়গেন্সের পরীক্ষার
মতো সমলয়ে বাঁধা
পেন্ডুলাম-জুড়ি

এই সমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে পেন্ডুলামের সমলয়তার ওপর কিছুটা আলোকপাত হয়েছে। এই ঘটনাটিকে গাণিতিক রূপ দেওয়ার মতো হাতিয়ার হয়গেন্সের কালে ছিল না, ডিফারেনসিয়াল ক্যালকুলাস মধ্য ১৭ শতকের আগে উদ্ভাবিত হয়নি - কিন্তু আমরা এখন বুঝতে পারি, হয়গেন্স সমস্যার গোড়ার ব্যাপারটা ঠিকই ধরেছিলেন। দুটি পেন্ডুলাম একই তালে দোলার কারণ হল, তারা যে অবলম্বনের ওপর বসানো আছে, তার মারফত যান্ত্রিক কম্পনের মধ্য দিয়ে তারা একে অপরের প্রতি শক্তি সরবরাহ করে। প্রথমে ঘড়ি দুটি বিপরীত দশায় দোলে, অন্য ভাবে বললে, তখন একটির কম্পনের ফলে সাধারণ অবলম্বনের মাধ্যমে অপর ঘড়িটির পাঠানো কম্পনটা প্রশমিত হয়ে যায়

এত সব জানা সত্ত্বেও, এবং হয়গেন্সের আবিষ্কারের ৩৫০ বছর পরেও বহু প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। যেমন, দুটি পেন্ডুলামের সমলয়ে দোলার ন্যূনতম শর্তগুলো কী? যে কোনো একজোড়া পেন্ডুলাম কি এক তালে দুলতে পারে – নাকি কেবল বিশেষ ধরনের হলে তবেই সেটা সম্ভব? দুইয়ের বেশি পেন্ডুলামকে কি সমলয়ে দোলানো সম্ভব? এই সব প্রশ্নের তত্ত্বতালাশ বিজ্ঞানীরা শুরু করেছেন সবে এই সহস্রাব্দের প্রারম্ভে।

২০০২ সালে আমেরিকার জর্জিয়া টেক প্রতিষ্ঠানে কুর্ট উইজেনফেল্ড-এর নেতৃত্বে একটি দল হয়গেন্সের পরীক্ষাটার অপেক্ষাকৃত সরল একটা সংস্করণ তৈরি করেন। সেখানে পেন্ডুলামের বদলে যান্ত্রিক মেট্রোনোম ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের সিদ্ধান্ত, হয়গেন্স যে সহমর্মিতা লক্ষ করেছিলেন সেটা বহুলাংশে নির্ভর করে ‘কাপলিং ক্ষমতা’র ওপর - সেটা হল পেন্ডুলাম দুটোর মোট ভর আর সংযোজক যে পাটাতনের ওপর সেগুলো ঝুলছে তার মোট ভরের অনুপাত। আনুপাতিক মান বেশি হলে পেন্ডুলামগুলোর নিজেদের মধ্যে ভাল সমঝোতা হয়, অনুপাতের মান লঘু হলে সমঝোতা তেমন জমে ওঠে না। অনুপাতের মান কম হলে পেন্ডুলাম দুটি সমলয়ে বিপরীত দিকে দুলতে থাকে, আবার অনুপাতের মান বেশি হলে দেখা যায় ‘বিটিং ডেথ ফেনোমেনন’ - একটা পেন্ডুলাম দুলতে থাকে, অপরটা থেমে যায়, যেমনটা এলিকট আগে দেখেছিলেন।

প্রায় একই সময়ে আলাস্কা অ্যানকোরেজ ইউনিভারসিটিতে জেমস পেন্টালিয়ন একটি অভিনব পরীক্ষা চালান, তিনি দুটো খালি ড্রিঙ্কসের ক্যানের ওপর একটা কাঠের বোর্ড রেখে তার উপরে দুটি মেট্রোনোম এমন ভাবে রাখেন যাতে সমগ্র কাঠামোটি গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে পারে। তিনি লক্ষ করেন, মেট্রোনাম দুটি সমলয়ে একই তালে কিন্তু একই দিকে দুলছে, অর্থাৎ হয়গেন্স ও এলিকট যা লক্ষ করেছিলেন তার উল্টোটা। 

আইন্ডহোভেন ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজিতে
হয়গেন্সের পরীক্ষার একটা অত্যাধুনিক সংস্করণ
এই রহস্যটা আমাদের বেশ মনে ধরেছিল। আমরা তাই ২০০৫-এ, আইন্ডহোভেন ইউনিভার্সিটি 
অফ 
টেকনোলজিতে হয়গেন্সের পরীক্ষার একটা অত্যাধুনিক সংস্করণ বসালাম। এতে রইল দুটো মেট্রোনোম, সেদুটো বসানো হল একটা পোক্ত ধাতুর দণ্ডের ওপর, আর সেটাকে ঝোলানো হল স্প্রিঙের পাতে ভর রেখে। অতীতের পর্যবেক্ষণগুলোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই আমরা দেখলাম দু ধরনের ফলাফল এ থেকে পাওয়া যাচ্ছে। দণ্ডটা যদি তুলনায় হালকা হয় তবে মেট্রোনোম দুটো একই দিকে সমলয়ে দুলতে থাকে। কিন্তু দণ্ডটা যদি একটা নির্দিষ্ট ওজনের থেকে বেশি ভারী হয় তবে মেট্রোনোম দুটো একই তালে কিন্তু বিপরীত দিকে দুলতে থাকে, ঠিক যেমনটা হয়গেন্স দেখেছিলেন। দণ্ডটার ওজন কম করে ২.৩৫ কিলো হলে এই দ্বিতীয় ধরনটা দেখা যায়

সংযোজক দণ্ডটা হালকা হলে সম্পূর্ণ সমলয় ঘটতে সুবিধা হয়, কারণ তখন মেট্রোনোম দুটোর কাপলিং শক্তি তুলনায় বেশি থাকে। দণ্ডটা তুলনায় ভারী হলে কাপলিং শক্তি তুলনায় কমে যায়, ফলে মেট্রোনোম দুটোর দোলনদশা আলাদা হয়। আমরা নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র কাজে লাগিয়ে সহমর্মী মেট্রোনোমগুলোর একটা গাণিতিক মডেলও গড়েছিলাম। তাতে দেখা গেল, সমলয় সৃষ্টির পিছনে প্রধান চাহিদাগুলো হল মেট্রোনোমগুলোর ভর আর দোলনের কম্পাঙ্ক, সেই সঙ্গে দণ্ডটার ভর আর যে-স্প্রিঙের ওপর সেটা বসানো তার কাঠিন্যও এতে ধরতে হবে।


এক জোড়া পেল্লায় পেন্ডুলামের সাহায্যে করা পরীক্ষা

সম্প্রতি হয়গেন্সের পরীক্ষাটার একটা আধুনিক সংস্করণ আমরা নির্মাণ করেছি
দুটো পেল্লায় পেন্ডুলাম দিয়ে, যার পরিকল্পনা ও নকশা করেছেন মেক্সিকোর জ্যাকাতল্যান্ডের প্রখ্যাত ঘড়ি নির্মাতা সংস্থা, রেলোহেস সেন্টেনারিও। ঘড়ি দুটির প্রতিটি পেন্ডুলামের সঙ্গে যুক্ত কাঠের দণ্ডের দৈর্ঘ্য প্রায় এক মিটার, দণ্ড দুটির নিচে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে পাঁচ কেজি ভরের ধাতুপিণ্ড। ঘড়ি দুটোর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ‘anchor–escapement mechanism, এটা পেন্ডুলামের গতি বজায় রাখে, এবং এ থেকেই পরিচিত টিক টক শব্দটা সৃষ্টি হয়। ঘড়ি থেকে ঝোলানো ওজনের সঙ্গে এটা জোড়া থাকে, দুলন্ত পেন্ডুলামটা একটা নির্দিষ্ট কোণে পৌঁছতেই ওই কাঠামোটি পেন্ডুলামটাতে একটা গুঁতো দেয়, আর এভাবেই পেন্ডুলামের দোলন নিয়ন্ত্রণ করে।

এই যন্ত্রের সাহায্যে আমরা দেখলাম, প্রায় ৩০ মিনিট চলার পর দুটি পেন্ডুলামই একই দশায় সমলয়ে একই দোলন কালে দুলতে থাকে। পেন্ডুলাম দুটোর ভেতর ওই এসকেপমেন্ট মেকানিজমকে চালানোর মতো শক্তি যতক্ষণ সঞ্চিত থাকে ততক্ষণ পেন্ডুলাম দুটো সমলয়ে দোলে। প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর ওজন দুটোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা ছিল এতে, ফলে যতক্ষণ খুশি এই ঘড়ি দুটোকে চালানো সম্ভব। সেটা না করলে ঘড়ি দুটি ১৪ ঘণ্টা চলার পর বন্ধ হয়ে যেত।

এ যন্ত্রটা কাজে লাগিয়েই বহু বছর আগে হয়গেন্সের আবিষ্কৃত রহস্যটার কিনারা করতে পেরেছিলাম আমরা। তাঁর ধারণা ঠিকই ছিল: যে-কাঠের কাঠামোর সঙ্গে পেন্ডুলাম দুটি ঝোলানো থাকে তার মাধ্যমে কম্পন, যা মূলত শক্তির রূপভেদ, পাঠিয়ে একটি পেন্ডুলাম অপরটিকে প্রভাবিত করে, তারা একই ছন্দে দুলতে থাকে। যদিও আমাদের আধুনিক ঘড়িটি পাইন কাঠের টেবিলের উপর রাখা হয়েছিল, আর হয়গেন্সের পেন্ডুলামটা ঝোলানো ছিল একটা কাঠের পাটা থেকে, তবু উভয় ক্ষেত্রেই ঘটনাটার মূলে আছে কাঠের নমনীয় বিকৃতি, এককথায় তাতে বাঁক ধরা এবং পুনরায় আগের দশায় ফিরে যাওয়ার ক্ষমতা।

তবে আমাদের পরীক্ষাতে কিছু নতুন বিষয়ও ধরা পড়েছে যেটা হয়গেন্সের জানা ছিল না। যেমন, কাঠের টেবিলের উপরে বসানো সমলয়ে চলা একজোড়া পেন্ডুলাম ঘড়ি নিখুঁত সময় দিতে অপারগ, এটি প্রতি ঘণ্টায় ৪৭ সেকেন্ড অর্থাৎ সারা দিনে ১৯ মিনিট সময় খুইয়ে ফেলে। তাই হয়গেন্স যদি দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়ের কাজে তাঁর পেন্ডুলাম ঘড়ির ব্যবহারের জন্য জেদ ধরতেন, এবং ঝড়ের দুলুনিতেও যদি পেন্ডুলামের দোলা বন্ধ না হত, তবে এগুলোতে যে সময় ধরা পড়ত তা বাস্তব সময়ের থেকে অনেকটাই আলাদা হত

জোটবদ্ধ পেন্ডুলামের আরও অনেক অবাক করা গুণ আছে। যেমন, আচমকা বন্ধ হয়ে যাওয়া, আপাতদৃষ্টিতে এলোমেলো দোলন, এবং আরও নানা বিসদৃশ আচরণ।

কথা হল, আমরা কি তবে হয়গেন্সের সহমর্মিতা ধর্মটার সঠিক ব্যাখ্যা জোগাতে পারলাম? এক কথায় এর উত্তর, না। সমস্ত গাণিতিক মডেল, এমনকি আমাদের তৈরি করা মডেলও অসম্পূর্ণ, কারণ আমরা কাঠের পাতাটনটি, যার সঙ্গে পেন্ডুলামটা ঝুলছে, তার সমস্ত চ্যুতিবিচ্যুতিকে অঙ্কের সূত্রে ঢোকাতে পারিনি।

মাদের বিশ্বাস একদিন এই সমস্যার সমাধান বেরবে, শুধু হয়গেন্সের জোড়া ঘড়ির সমস্যাটি নয়, এর ফলে আরও অনেক যন্ত্রব্যবস্থার রহস্যেরও সমাধান মিলবে তা থেকে। যেমন কোনও স্থিতিস্থাপক অবলম্বনের ওপর বসানো দুটো ভারসাম্যহীন রোটর বা ঘূর্ণকের আচরণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোটর দুটি একই দিকে পাক খাবে, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তারা পরস্পরের বিপরীত দিকে ঘুরতে শুরু করবেবিপরীত ঘূর্ণনটার ব্যবহারিক উপযোগিতা আছে, কারণ সেটা যে-অবলম্বনে ওগুলো বসানো তার কম্পন রোধ করতে পারে। কিন্তু একই দিকে সমলয়ে ঘূর্ণন ভাল নয়, কারণ তার ফলে কাঠামোটার কম্পন ভীষণ বেড়ে যেতে পারে। কাপড় কাচার মেশিনে ওরকম মাঝে মাঝে হয়ে থাকে।

মানুষের শরীরের উদাহরণও দেওয়া যেতে পারে। সেখানেও বিভিন্ন প্রকারের পরিবর্তমান ছন্দ কাজ করছে, যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদ-স্পন্দন, নিউরনের সক্রিয়তা, রক্তের অভিস্রবণ, সমলয়ে থাকলে এগুলোর জন্য সামান্যই শক্তির প্রয়োজন হয়। এটা একটা ভালো দিক, কিন্তু সমলয় অবস্থার একটা খারাপ দিকও আছে, যেমন কয়েক কোটি নিউরনের অনিয়ন্ত্রিত সমলয়ে চলা কম্পন থেকে জন্ম নিতে পারে এপিলেপটিক সিজার, তড়কা লাগা যাকে বলি।

আমাদের বিশ্বাস, হয়গেন্সের পথ ধরে এ ধরনের সমলয় পেন্ডুলাম ঘড়ি বিষয়ে অনুসন্ধান আমাদের জড় ও জৈব জগৎ সম্পর্কে অনেক নতুন অন্তর্দৃষ্টি জোগাতে পারে। আমরা সাম্প্রতিক এক গবেষণাপত্রে ইলেকট্রনিক নিউরনের সমলয় নিয়ে আলোচনা করেছি, যা একটা সচল রোবোট তৈরিতে সাহায্য করতে পারে, এমন রোবোট যা অচেনা পরিপার্শ্বেও বাধা এড়িয়ে চলাফেরা করতে সক্ষম। কে ভাবতে পেরেছিল হয়গেন্সের অত বছর আগের এক পর্যবেক্ষণ আজ এমন সব সম্ভাবনার জন্ম দিতে পারে?

 

অনুবাদ: রণজিৎ দাশগুপ্ত

 

সমলয়ে আবদ্ধ পেন্ডুলাম-জুটি নিয়ে এই নিবন্ধটি ‘The secret of the synchronized pendulums’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল ফিজিক্সওয়ার্ল্ড ওয়েবসাইটের ২১ জানুয়ারি ২০২০ সংখ্যায়।

জোনাটন পেনিয়া রামিরেজ (Jonatan Pena Ramirez), মেক্সিকোর সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যান্ড হায়ার এডুকেশন অ্যাট এনসেনাডা-য় কর্মরত গবেষক। 

হেংক নেইমাইয়ের (Henk Nijmeijer) নেদারল্যান্ডস-এর আইন্ডহোভেন ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির সঙ্গে যুক্ত।

ভ্যাকসিন: বিভ্রম আর দুর্ভাবনা

  ভ্যাকসিন: বিভ্রম আর দুর্ভাবনা কৌস্তুভ পান্ডা   সমগ্র মনুষ্যজাতিকে যতরকম সাধারণ শত্রুর সঙ্গে লড়তে হয়েছে, তার কোনওটাই কোভিড-১৯-এর সঙ্গে ...