Tuesday, April 7, 2020

কোন মুখোশ নিরাপদ?






কোন মুখোশ নিরাপদ?

ম্যান্ডি ওকল্যান্ডার



আমার যদি করোনা-আক্রান্ত হওয়ার কোনও লক্ষণ না থাকে তাহলেও কি মুখোশ পরা উচিত? এই প্যানডেমিকের নানা সময়ে এই কথাটাই বারে বারে ঘুরেফিরে এসেছে। এতদিন পর্যন্ত এর উত্তরটাও ছিল সরল, অন্তত যদি আমরা আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর কথা মেনে চলি।  ৩ এপ্রিল পর্যন্ত সিডিসি এই প্রশ্নের উত্তরে বলছিল: না, মুখোশ পরার দরকার নেই।...

কিন্তু মাস্ক সম্পর্কে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে এখন। ৩ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাধারণ মানুষকে সিডিসি-র নির্দেশ অনুসারে নন-মেডিক্যাল মাস্ক পরতে বলেছেন। বাড়ি থেকে যদি বেরতেই হয়, যেমন ধরা যাক দোকান-বাজার করতে, তবে মাস্ক পরা জরুরি।  নন-মেডিক্যাল মাস্ক মানে হল নাক ও মুখ ঢাকা কাপড়ের মুখোশ। মাথায় বাঁধা ফেট্টি, যাকে ইংরেজিতে বলে ব্যানডানা, এবং টি-শার্ট তৈরি হয় যে-কাপড়ে সেরকম কিছু দিয়ে বানানো। এই সাবধানতা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক।...

২৬ মার্চ আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ-এর ডিরেক্টর অ্যান্টনি ফসি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘আমরা যখন বলছিলাম যে আপনার মুখোশ পরার দরকার নেই তখন আমরা আসলে বলতে চাইছিলাম মুখোশ পরার প্রয়োজন কার বেশি সেটা বুঝে নিয়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মুখোশ পরা উচিত। কোনও আদর্শ পৃথিবীতে, যেখানে যত চাই তত মুখোশ মেলে, সেখানে কেউ মুখোশ পরে রাস্তায় হাঁটলে আমার কোনও আপত্তি থাকতে পারে না। ওটার মাধ্যমে আপনি তো কিছুটা বেশি সুরক্ষা পেতেই পারেন।’’

প্রশ্ন হল, মাস্ক কি সত্যিই নীরোগ মানুষকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে? একটা টি-শার্টের কাপড় কি আমাকে রোগের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে? উত্তরগুলো নিয়ে কিছু জটিলতা আছে, সবটা এখনও বোঝা যায়নি। চিকিৎসকরা এবং মাস্কের উপযোগিতা নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁরা কী বলছেন দেখা যাক।

বিজ্ঞানীরা জানেন, নয়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, কিন্তু রোগের কোনও লক্ষণ তখনও যার মধ্যে ফোটেনি এমন মানুষেরাও সংক্রমণ ছড়াতে পারেন। (এ কথাটা রোগটা যখন দেখা দিল তখন জানা ছিল না।) সিডিসি-র ডিরেক্টর রবার্ট রেডফিল্ড সম্প্রতি এক সংবাদমাধ্যম, এনপিআর-কে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সংক্রমিত মানুষদের শতকরা ২৫জনের ভেতর রোগের কোনও লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে। যাদের শরীরে রোগের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে তারাও ওই লক্ষণ দেখা দেওয়ার দুদিন আগে থাকতেই সম্ভবত রোগটা ছড়াতে থাকেন। ‘‘রোগটা কীভাবে দেশের ভেতর এতদূর ছড়িয়েছে তার একটা কারণ বোধহয় পাওয়া যাচ্ছে এখান থেকে।’’ বলেছেন রেডফিল্ড।

রোগটার এমন নীরব পদসঞ্চারের ফলে বাইরে বেরনো সমস্ত সাধারণ মানুষের মুখোশ পরার স্বপক্ষে যুক্তিটাই ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে, কারণ কে যে সংক্রমিত আর কে যে নয় তা বোঝা যাচ্ছে না।...

দুটো মতবাদেরই – অর্থাৎ এক, প্রত্যেক  সাধারণ মানুষেরই মুখোশ পরা দরকার, আর দুই, সমস্ত আমআদমির মুখোশ পরার দরকার নেই – দু’পক্ষেরই যথেষ্ট গোঁড়া সমর্থক মজুত আছে।  প্রথম দলে যাঁরা, তাঁরা দেখাচ্ছেন যে, ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগাক্রান্ত মানুষদের থেকে রেহাই পেতে মুখোশ ব্যবহারের সুফল আছে – তা সে সুফল যত সামান্যই হোক না কেন, আর তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণও আছে।

দ্বিতীয় দলে যাঁরা আছেন, তাঁরা মনে করেন, বৈজ্ঞানিক সাবুদ যা মিলছে তাতে পথেঘাটে মুখোশের কার্যকারিতাকে এমন মনে হচ্ছে না যে, প্রত্যেককে তা পরতে বলাটা যৌক্তিক কাজ হবে। বরং, ওটা পরে থাকলে লোকের মনে একটা ভ্রান্ত নিরাপত্তার ভাব তৈরি হতে পারে, তারা হয়তো অকারণ সাহসী হয়ে যেসব বিধিনিষেধ আসলে জরুরি এবং কার্যকর, সেগুলোকেই অগ্রাহ্য করতে থাকবে – যেমন, প্রত্যেকের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করে চলা। তাঁরা আরও মনে করেন যে, মুখোশ পরা অবস্থায় তারা হয়তো অজান্তেই অনেক বেশি করে মুখে হাত দেবেন।

কানাডার সংক্রামক রোগের গবেষক-চিকিৎসক আইজাক বোগোচ বলছেন, ‘‘আমার মনে হয় আমাদের বেশ একটু সততার সঙ্গে স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, কিছু কিছু প্রমাণ থেকে ইঙ্গিত মিলছে, মাস্ক পরার সম্ভাব্য সুফল আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে বেশ কিছু সতর্কতার অবকাশও জুড়ে আছে। ... এটা ভীষণ সত্যি যে, মাস্ক পরা বহু মানুষের বেলাতেই সেটা পরার যে-সুবিধে তা নষ্ট হবে যদি সে ভুল ধরনের মাস্ক পরে, কিংবা ধরা যাক যদি সে মাস্কটা ঠিকঠাক করে বসানোর জন্যই বারবার মুখে হাত ঠেকায়। যে মানুষটা দূরত্ব রাখার সব নিয়মকানুন ঠিকঠাক মানছে, যে অন্তত ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখছে অন্য মানুষেোর থেকে, তার বেলা মুখোশ পরাটা অতিরিক্ত কোনও সুবিধে দেবে না।’’

আমেরিকায় প্রয়োজনীয় মাস্কের  সরবরাহ এত কম যে স্বাস্থ্যকর্মীরাই করোনাভাইরাস রোগীদের সঙ্গে কাজ করার মতো পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইউনিট (পিপিই) পাচ্ছে না। তার মধ্যে আছে এন-৯৫ রেস্পিরেটর (শক্ত করে মুখে আঁটা যায় এমন একটা মুখোশ তাতে হাঁচি-কাশি থেকে ছিটকে বেরনো অণুবিন্দু, যাতে ভাইরাস ব্যাকটিরিয়া লেগে থাকতে পারে, আটকে যায়। কিন্তু খুব সূক্ষ্ম কিছু আটকায় না)।

‘‘আমরা জানি যে, যারা স্বাস্থ্যপরিষেবা দিচ্ছে তাদেরই সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেক বেশি, মানে, যে ধরনের কাজ এদের করতে হয় বা যে ধরনের রোগীদের নিয়ে করতে হয় তার ভিত্তিতে বলছি।’’ বলেছেন ড. এরিকা শেনয়, তিনি ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের ইনফেকশন কন্ট্রোল ইউনিটের অ্যাসোসোসিয়েট চিফ। মুখোশের ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে যখন হাত ধোওয়া, চোখ সুরক্ষিত রাখা, গ্লাভস আর গাউন পরা এইসব সতর্কতা পালন করা হয়, তখন স্বাস্থ্যকর্মীরা সত্যিই সুস্থ থাকতে পারেন, যেমন সুস্থ থেকেছেন কোভিড-১৯ রোগীদের সঙ্গে কাজ করার সময়।

মুখোশের টানাটানির দরুন আমেরিকা সরকার সাধারণ নাগরিকদের যে মুখোশ পরতে বলছেন তা এন-৯৫ বা সার্জিক্যাল মাস্ক নয়, বরং ঘরে বানানো মুখোশ। তবে, যদি একসময় টানাটানি মিটেও যায়, সকলে মুখোশ পরতেও পারে, তাতে সুরক্ষা আদৌ আসে কি না সেটাও জেনে নেওয়া দরকার।

আমাদের শ্বাসব্যবস্থাকে আক্রমণ করে এমন ভাইরাস আটকাতে সার্জিক্যাল মাস্ক কতটা কার্যকর তা নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে। ‘‘এগুলোতে ধরা পড়েছে যে, অল্প কিছু সুফল এর সত্যিই আছে এবং মাস্ক পরার তেমন কোও ক্ষতিকর প্রভাবও নেই।’’ বলেছেন অ্যালিসন আয়েলো, ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলিনাতে এপিডেমিওলজির অধ্যাপক। ২০১০-এ মুখোশের উপযোগিতা সংক্রান্ত একটা গবেষণাপত্রের তিনি সহলেখক। তাঁর করা একটা গবেষণার ফলাফল দেখাচ্ছে, ফ্লু চলছে এমন এক সময়ে কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ওপর মাস্ক পরার তেমন কার্যকারিতা এমনিতে দেখা যায়নি, সুফল দেখা গেছে যখন মাস্ক পরার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম মেনে তারা হাতও ধুয়েছে।

২০০৯-এ প্রকাশিত আর-একাট গবেষণা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায়। ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগে আক্রান্ত বাচ্চাদের দেখাশোনা করার সময় পরিবারের সদস্যরা যখন নিয়ম করে মুখোশ পরেছেন, দেখা গেছে তাঁরা নিজেরা কম আক্রান্ত হয়েছেন।

সিডিসি সম্প্রতি জানিয়েছে, চিকিৎসা-মানের মাস্ক যদি না পাওয়া যায় তাহলে স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরে তৈরি মুখোশ ব্যবহার করতে পারে, যেমন মাথায় বাঁধা ফেট্টি অর্থাৎ  ব্যানডানা এবং স্কার্ফ। ‘‘অবশ্যই ঘরে তৈরি মাস্ককে পিপিই বলা চলবে না, কারণ সেগুলো কতটা সুরক্ষা দেয় তা এখনও অজানা।’’ এরকম জিনিস ব্যবহার করার সময় অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

ঘরে তৈরি মাস্ক আদপে নিরাপদ কি না তা নিয়ে ২০১৩য় একটা সমীক্ষা হয়েছিল। গবেষকরা ঘরেই মেলে এমন নানা কিছু দিয়ে মুখোশ বানিয়ে দেখছিলেন সেগুলো ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস যুক্ত এরোসল (বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম কণা) কতটা আটকাতে পারে, এবং  সেই জিনিস দিয়ে বাস্তবে ব্যবহারোপযোগী মুখোশ কীভাবে বানানো যেতে পারে। তাঁদের পরীক্ষিত জিনিসগুলোর মধ্যে ছিল সুতির টি-শার্ট, স্কার্ফ, চা-পানের সময় ব্যবহৃত ছোট তোয়ালে, বালিশের ওয়াড়, ভ্যাকুয়াম ক্লিনারে ব্যবহৃত থলে। তাঁরা দেখলেন, সবথেকে কার্যকর মুখোশ বানানো যায় ১০০%  সুতির টি-শার্ট দিয়ে কিংবা বালিশের ওয়াড় দিয়ে। তবে, টি-শার্টের কাপড়ের স্ট্রেচি-ভাবের কারণে তা দিয়ে বানানো মুখোশটা পরতে সুবিধে হয়। স্বেচ্ছাকর্মীরা টি-শার্ট দিয়ে নিজেরাই মুখোশ বানিয়ে (কীভাবে বানানো যায় তার উপায় দেখানে আছে এই রচনায়) তার মধ্য দিয়ে কেশে দেখছিলেন সেটা কেমন কাজ করে। তুলনার জন্য একইভাবে কাশির ফলাফল দেখা হয়েছিল সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করে এবং কোনও মাস্ক ছাড়াই। দেখা গেছে ছোট ছোট সংক্রামক কণা আটকানোর কাজে টি-শার্ট দিয়ে বানানো মাস্ক সার্জিক্যাল মাস্কের মাত্র তিন ভাগের একভাগ কার্যকর।... ‘‘কিছু না থাকার চেয়ে এটা থাকা ভাল’’, বলেছেন আনা ডেভিস, এই গবেষকদলের একজন, তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর।  

... তবে ঘরে তৈরি মাস্কে যে হিতে বিপরীত হতে পারে তেমন সম্ভাবনাও দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় করা এক গবেষণায় দেখা গেছে মাস্ক ব্যবহারকারীরা যতটা নিয়ম মেনে তাদের মাস্কগুলো ধোয়ার কথা ছিল তেমনটা করেননি। রায়না ম্যাকইনটায়ার, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলসের অধ্যাপক এবং উপরোক্ত গবেষণার সহযোগী, বলছেন, ‘‘আমরা জানতে পেরেছি মাস্কগুলো ভীষণ স্যাঁতসেঁতে, ভিজে ভিজে হয়ে পড়ে।’’ এবং ‘‘ভিজেভাবের কারণে সেখানে রোগজীবাণু বাড়তে থাকে। কাজেই লোকেরা যদি সেটা ঠিকঠাক না ধুয়ে ব্যবহার করে চলে তাহলে সংক্রমণের সম্ভাবনা তো থেকেই যায়। সাধারণ মানুষ যদি ঘরে তৈরি মাস্ক ব্যবহার করতেই চায় তাহলে তাতে একাধিক স্তর রেখে বানানো ভাল, এবং এমন কাপড় ব্যবহার করা উচিত যা জল টানে না।
ব্যাপারটা এখনও অপরিষ্কার, কিন্তু আইয়েলো বলছেন, ‘‘কাপড়টা যেহেতু কিছুটা হলেও রোগ-ছড়ানো অণুবিন্দু ঠেকাতে পারে, কাজেই অন্তত খাতায়-কলমে ওই আড়ালটা সঙ্গে রাখাই ভাল, তাতে কোনও কোনও পরিস্থিতিতে কিছু কিছু সংক্রমণ তো আটকানো যেতেই পারে।’’

‘‘মুখোশ যদি পরতেই চাও তো পরো,’’ বোগোচ বলছেন, ‘‘কিন্তু এ থেকে সম্ভাব্য কী উপকার পাওয়া সম্ভব সেটা যেমন মনে রাখতে হবে তেমনই এর সীমাবদ্ধতাগুলো কী কী, জানতে হবে সেটাও। আর বাস্তববোধটাকে সজাগ রাখতে হবে।’’

অনুবাদ: যুধাজিৎ দাশগুপ্ত

ShouldHealthy People Wear Masks to Prevent Coronavirus? The Answer May Be Changing শিরোনামে এই রচনাটা বেরিয়েছে ৩ এপ্রিল ২০২০, টাইম পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে। এখানে তার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ আছে

Monday, April 6, 2020

মুখোশ পরব, কি পরব না

মুখোশ পরব, কি পরব না

ডিয়ানি লিউয়িস


বাইরে বেরলেই মুখোশ পরা জরুরি কিনা তা নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করছে বহু দেশ [Pic:newsbharati.com]






















করোনাভাইরাস কি বাতাস বেয়ে সংবাহিত হতে পারে? ক’দিন আগে থাকতেই, যখন থেকে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে যে, মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে, গবেষকরা এটার উত্তর খুঁজে চলেছেন। স্বাস্থ্য অধিকর্তারা বলছেন এটা কেবল কাশি বা হাঁচির সঙ্গে ছিটকে বেরনো অণুবিন্দু মারফতই প্রবাহিত হয় - হয় সরাসরি, নয় কোনও বস্তুতে লেগে থেকে। কিন্তু বেশ কিছু বিজ্ঞানী বলছেন, বাতাস মারফত করোনাভাইরাস সংবাহিত হওয়ার প্রাথমিক প্রমাণও মিলেছে। আমাদের নিশ্বাসবায়ুতে মিশে থাকা অনেকগুণ সূক্ষ্মতর কণা, যাকে বলে এরোসল, তার মধ্য দিয়েও এটা ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদি সাবধানতা অবলম্বন করা যায়, যেমন ঘরের ভেতর বায়ু চলাচল বাড়ানো, তবে সংক্রমণের আশঙ্কা কমানো যেতে পারে।

২৭ মার্চ তারিখে একটা বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (হু) জানিয়েছে, সার্স-কভ-টু-র বায়ুবাহিত ভাইরাস, এমন মতের স্বপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ কিছু নেই। চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার কিছু বিশেষ অবস্থায়, যেমন যখন সংক্রামিত রোগীকে কোনও টিউব পরানো হচ্ছে, তেমন সম্ভাবনা অবশ্য থেকে যেতে পারে।

যে-বিশেষজ্ঞরা বায়ুবাহিত শ্বাসঘটিত ব্যাধি এবং এরোসলের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন তাঁরা বলছেন, করোনাভাইরাসের বায়ুবাহিত চরিত্রের সর্বজনগ্রাহ্য প্রমাণ জোগাড় করতে কয়েক বছর হয়তো লেগে যাবে, আর তার মাঝখানে হয়তো বহু প্রাণ বিনষ্ট হবে। ‘‘নিখুঁত প্রমাণ পাওয়ার তাগিদ যেন ব্যাপারটা সম্যক বুঝে নেওয়ার পথে কাঁটা হয়ে না দাঁড়ায়,’’ বলেছেন মাইকেল ওস্টারহোলম, মিনিয়াপোলিসের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ইনফেকশাস-ডিজিজ এপিডেমিওলজিস্ট।

‘‘যে-বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে কাজ করে চলেছেন তাঁদের মনের মধ্যে তিলমাত্র সন্দেহ নেই যে ভাইরাসটা বাতাস বেয়ে ছড়ায়’’, বলছেন লিডিয়া মোরাওস্কা, অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে কুইনসল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির এরোসল সায়েন্টিস্ট।

জনস্বাস্থ্য আধিকারিকরা যখন বলছেন যে, কোভিড-১৯ বায়ুবাহিত এমন কোনও প্রমাণ নেই, তখন তাঁরা বোঝাতে চাইছেন ভাইরাস-মাখা কিছু কণা যেগুলোর মাপ ৫ মাইক্রোমিটারেরও কম, যাকে বলে এরোসল, সেসবের বাতাসে ভেসে পরিবাহিত হওয়ার কথা। যেসব বিন্দু তুলনায় বড়সড়, সেগুলো কারও হাঁচি বা কাশি থেকে বেরিয়ে এসে সামান্য গিয়েই মাটিতে বা অন্য কোনও বস্তুর ওপর পড়ে আটকে যায়, এটাই সাধারণ ধারণা। ওদিকে এরোসলগুলো বাতাসে ভেসে থাকতে পারে এবং অনেকদূর অবধি যেতে পারে।

বেন কাউলিং হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এপিডেমিওলজিস্ট। তাঁর মতে, বেশিরভাগ সংক্রমণই খুব কাছাকাছি পাল্লার মধ্যে ঘটে। কিন্তু অণুবিন্দু আর এরোসলের মধ্যে ফারাক করলে খুব একটা লাভ হবে না। কেননা, ‘‘ভাইরাস সঙ্গে নিয়ে যেসব কণা বেরিয়ে আসে সেগুলো নানা মাপের হয়। বড়, খুব বড় থেকে একেবারে এরোসলের মতো সূক্ষ্ম কণা অবধি।’’

আর, সার্স-কভ-টু যদি এরোসল পরিবাহিত হতে পারে তবে এ-ও খুবই সম্ভব যে, আবদ্ধ জায়গায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ক্রমশ জমে উঠতে পারে কিংবা অনেকদূর অবধি পরিবাহিত হতে পারে।

কথা বলা বা নিশ্বাস ছাড়ার সময়েই এরোসলগুলো বেশি করে তৈরি হয়। কাজেই তা হাঁচি বা কাশির থেকেও বেশি বিপজ্জনক। এই মত ব্রিটেনের ইউনিভার্সিট অফ লেস্টার-এর ভাইরোলজিস্ট জুলিয়ান ট্যাং-এর: ‘‘কেউ যখন কাশে, বা হাঁচি দেয়, তখন একটু মুখ ফিরিয়ে নেয়।’’ কিন্তু আমরা যখন কথা বলি বা নিশ্বাস ছাড়ি তখন তো সেটা আর করি না।

ইনফ্লুয়েঞ্জা-আক্রান্ত মানুষদের নিয়ে করা কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে রোগীদের ৩৯ শতাংশই সংক্রামক এরোসল ত্যাগ করছে। আমরা যখনই কারও সঙ্গে একই বাতাসে নিশ্বাস নিই, তারা যে বাতাস ত্যাগ করছে সেটাই আমরা শ্বাসের সঙ্গে টেনে নিই, তখনই বাতাসবাহী সংক্রমণ সম্ভব হয়ে ওঠে।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষেত্রসমীক্ষা থেকে এরোসল বেয়ে সার্স-কভ-টু ছড়ানোর স্বপক্ষে মিশ্র প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। চিনের উহানে যখন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব তুঙ্গে, তখন উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট কে. ল্যান, কোভিড-১৯-এর রোগীরা চিকিৎসাধীন রয়েছে এমন হাসপাতাল থেকে এরোসলের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। সেইসঙ্গে এরোসল নিয়েছিলেন দুটো জমজমাট ডিপার্টমেন্ট স্টোরের প্রবেশপথ থেকেও।

ল্যান এবং তাঁর সতীর্থদের লেখা একটা রিপোর্ট (প্রাক-মুদ্রণ অনলাইন প্রকাশ, রিভিউ হয়নি সেটার) বলছে, তাঁরা বেশ কয়েকটি জায়গা থেকে সার্স-কভ-টু-র আরএনএ পেয়েছেন, ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলো থেকেও।

তবে এই পরীক্ষাগুলোয় নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে না এইসব সংগৃহীত এরোসল আমাদের কোষে সংক্রমণ ঘটাতে পারে কিনা। ‘নেচার’ পত্রিকাকে লেখা এক ই-মেলে ল্যান জানিয়েছেন যে, এই গবেষণা দেখাচ্ছে, ‘‘কথা বলা বা শ্বাস ছাড়ার সময় এরোসলের মধ্য দিয়ে সার্স-কভ-টু-র সঞ্চার  সম্ভব হলেও হতে পারে, এবং উৎস থেকে কাছে বা দূরে থাকা মানুষের ওপর তার প্রভাবও পড়তে পারে।’’ সাবধান থাকার জন্য সাধারণ মানুষের পক্ষে ভিড় এড়িয়ে চলাই উচিত হবে, তিনি বলেছেন। এবং সবসময় মুখোশ পরা উচিত, যাতে ‘‘বায়ুবাহিত ভাইরাস থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।’’

সিঙ্গাপুরে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের অস্থায়ী আবাসে যেসব আইসোলেশন রুম ছিল তার বাতাসে সার্স-কভ-টুর সন্ধান করেছিল আর-একটা সমীক্ষা। সেখানে বাতাস বেরনোর পথে রাখা একটা পাখার গা থেকে ভাইরাসটির উপস্থিতি মিলেছিল। তবে, ওই সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত দুজন গবেষক, সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিজের কালীশ্বর মরিমুথি এবং উন টেক এং, নেচার পত্রিকাকে পাঠানো এক ই-মেলে জানিয়েছেন যে, একজন রোগী ওই পাখাটার এত কাছাকাছি ছিলেন যে তাঁর হাঁচি-কাশি থেকে ছিটকে আসা অণুবিন্দু থেকেও সেটা ঘটে থাকতে পারে। 

নেব্রাস্কায় আর-এক গবেষকদল তাঁদের সংগৃহীত বাতাসের দুই-তৃতীয়াংশ নমুনায় ভাইরাসের আরএনএ পেয়েছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে কোভিড-১৯-এ মারাত্মক রকমে আক্রান্ত মানুষদের এবং সেইসঙ্গে বিভিন্ন কোয়ারান্টিনে হালকা আক্রান্ত মানুষদের যেসব আইসোলেশন রুমে রাখা হয়েছিল সেখান থেকে বাতাস নিয়েছিলেন তাঁরা। বাতাস ঢোকা-বেরনোর পথে যে-জাফরি রাখা ছিল তার গা থেকেও মিলেছে ভাইরাসের লক্ষণ। তবে সেসব জায়গা থেকে পাওয়া কোনও নমুনাই মানুষের কোষকে সংক্রমিত করতে পারেনি। কিন্তু পরীক্ষার মাপজোখ বলছে, ‘‘কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের দ্বারা ভাইরাল এরোসল নিঃসরণ সম্ভব, এমনকী কাশি না থাকলেও’’, বলেছেন এই গবেষকরা।

হু যে বৈজ্ঞানিক বিবৃতি জারি করেছে তার বক্তব্য হল, এখনও অবধি প্রাপ্ত ভাইরাসের আরএনএ-র নমুনা ‘থেকে বলা যাচ্ছে না যে তাতে সক্রিয় ভাইরাস আছে এবং তা সংক্রমণ ঘটাতে পারে।’’ সেই বিবৃতিতে চিনে তাঁদের নিজেদের তরফে ৭৫০০০ কোভিড-১৯ রোগীর ওপর চালানো সমীক্ষার কথাও আছে, বলা হয়েছে ওতে তাঁরা বায়ুবাহিত সংক্রমণের কোনও প্রমাণ পাননি। বেন কাউলিং বলছেন, ‘‘(হু-র দেওয়া) এই অ্যাসেসমেন্টের স্বপক্ষে দাঁড় করানোর মতো তেমন যথেষ্ট প্রমাণ কিন্তু এতে নেই’’, এবং প্রমাণ মিলছে না বলে এও ধরে নেওয়া যায় না যে সার্স-কভ-টু বায়ুবাহিত নয়। এই অপ্রতুল প্রমাণের যাথার্থ্য সম্পর্কে নেচার-এর তোলা প্রশ্নের কোনও উত্তর  হু পাঠায়নি অন্তত এই লেখা প্রকাশিত হবার আগে অবধি।

আমেরিকার বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এই ভাইরাসটা এরোসলে ভাসমান থাকতে পারে এবং তার সংক্রামক চরিত্রও বজায় রাখতে পারে কম করে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত। যে-পরিবেশে  ওই পরীক্ষা করা হয়েছিল সেটা অবশ্য ‘অতিমাত্রায় কৃত্রিম’। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘বাতাস মারফত দূরপাল্লার সংক্রমণ সম্ভাবনা একেবারে শূন্য নয়’’, বলেছেন লস এঞ্জেলেস-এ ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সংক্রামক ব্যাধি গবেষক জেমি লয়েড-স্মিথ। তিনি এই গবেষণার অন্যতম সহকারী।

সার্স-কভ-টু-কে বায়ুবাহিত বলে মেনে নেওয়ার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে বলে মনে করেন না লিও পুন, হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট। এমন কিছু পরীক্ষা করা দরকার বলে তিনি মনে করেন যার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে এইসব বিভিন্ন মাপের অণুবিন্দুতে থাকা ভাইরাস সত্যিই রোগ ঘটায়।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের নাক-মুখ থেকে শঙ্কিত হবার মতো মাত্রায় ভাইরাস-পৃক্ত এরোসল বেরয় কি না সেটাও একটা প্রশ্ন, বলছেন লয়েড-স্মিথ। তিনি বলছেন, এই মানুষেরা যখন কথা বলছে, শ্বাস ছাড়ছে, হাঁচি বা কাশি হচ্ছে তাঁদের, তখন বাতাসের নমুনা নেওয়া দরকার, এবং পরীক্ষা করে দেখা দরকার তাতে সত্যিই সংক্রমণ-ক্ষম ভাইরাস আছে কিনাআর এসব কাজই ‘‘এই ধাঁধাটার আর-একটা বড় অংশ।’’ এরকম একটা পরীক্ষায় কোভিড-১৯ আক্রান্ত এক রোগী - যিনি কথা বলছেন, নিশ্বাস ছাড়ছেন, কাশছেন, তাঁর ১০ সেন্টিমিটার দূর থেকে বাতাসের নমুনা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেই পরীক্ষা থেকে ভাইরাসের আরএনএ-র অস্তিত্ব মেলেনি বটে, কিন্তু গবেষকরা বায়ুবাহিত ভাইরাস সংবহনের সম্ভাবনাকে একেবারে খারিজ করেও দেননি।

আর একটা জরুরি খুঁটিনাটি যেটা এখনও অজানা তা হল, ‘ইনফেকশাস ডোজ’ - কী মাত্রায় ভাইরাস থাকলে তা থেকে সংক্রমণ ঘটতে পারে, বলছেন লয়েড-স্মিথ। অর্থাৎ রোগ ঘটানোর জন্য কতগুলো সার্স-কোভ-টু কণা লাগে? ‘‘নিশ্বাসের সঙ্গে যে এরোসল-রূপী ভাইরাস বেরয় তার ইনফেকশাস ডোজ কত, কী মাত্রায় এলে সংক্রমিত হওয়ার পর্যাপ্ত সম্ভাবনা থাকে সেটা আমরা এখনও জানি না।’’ মাত্রাটা কী তা জানার জন্য পরীক্ষা সাজানোর একটা দায় আছে, জেনেবুঝে মানুষকে নানা মাত্রার আবহে রেখে প্রতি ক্ষেত্রে সংক্রমণের হার বের করা - এটা একটা অনৈতিক কাজ। বিশেষ করে আমরা যেখানে এ রোগের করাল চরিত্রটা জানি।

ট্যাং একটা ভিন্ন প্রসঙ্গ তুলেছেন। তিনি বলছেন, সংক্রমণ ঘটানোর জন্য পর্যাপ্ত মাত্রাটা যাই হোক না কেন, আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, কতক্ষণ ধরে একজন সেই পরিবেশে থাকছে। একবারের নিশ্বাসে হয়তো তেমন ভাইরাস বেরয় না, কিন্তু ‘‘তুমি যদি (আক্রান্ত কোনও ব্যক্তির) পাশে থাকো, একই বাতাসে শ্বাস নাও ৪৫ মিনিট ধরে, তাহলে সংক্রমিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভাইরাস তোমার মধ্যে ঢুকবে।’’

কিন্তু ক্রমান্বয়ে জমে জমে সংক্রমণ ঘটানোর মাত্রায় পৌঁছতে পারে এমন সামান্য পরিমাণ এরোসল সংগ্রহ করা – আর সেটাও সঠিক বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা আর তাপমাত্রার মিশেল মেনে, ‘এক চরম কঠিন কাজ’, বলেছেন মোরাওস্কা। ‘‘আরও ডেটা দরকার সেটা তো বলাই যায়, কিন্তু সেটা জোগাড় করা যে খুব কঠিন তাও স্বীকার করতে হবে।’’
ট্যাং বলছেন, বাতাস বেয়ে এই সংক্রমণ ছড়ায় সেটাই ধরে এগোনোই ভালো – যদি না পরীক্ষায় সেটাকে ভুল প্রমাণ করা যায়। কিন্তু উল্টোটা ধরে এগোনো ঠিক হবে না। মানুষ তাহলেই সাবধান থাকতে পারবে, নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করবে।

মোরাওস্কা বলছেন, ঘরের ভেতরকার বায়ু চলাচল বাড়ানো দরকার আর একই বাতাস ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করাটা কমানো দরকার। তাহলেই ভেতরকার বাতাসে এরোসলের ঘনত্ব কিছু কমানো সম্ভব, ঝেঁটিয়ে বের করে দেওয়া সম্ভব। সাবধানের মার নেই, কাজেই ঘরে বসে মিটিং করা বন্ধ রাখাই শ্রেয়।

ইতিমধ্যে ল্যান এবং তাঁর সতীর্থরা জনসাধারণকে মুখোশ পরে থাকতে বলছেন, তার মধ্য দিয়ে সংক্রমণের মাত্রা নামানো যাবে বলেই তাঁদের অভিমত। এশিয়ার বহু দেশেই মুখোশ একটা আটপৌরে উপকরণ। আমেরিকায় এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশে অবশ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকরা সাধারণ মানুষকে মুখোশ পরা থেকে নিবৃ্ত রাখতে চায়। তার একটা কারণ হল, এই উপকরণটির সরবরাহ কম এবং স্বাস্থ্যকর্মীদেরই সেটা আগে দরকার। চেক রিপাবলিক এবং স্লোভাকিয়া অবশ্য বাড়ির বাইরে বেরলেই সকলের মুখোশ পরা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। ট্যাং মনে করেন, এরা ঠিক কাজই করেছে। ‘‘ওরা সাউথ-ইস্ট এশিয়ার ধারাটা নিয়েছে, যদি প্রত্যেকে মুখোশ পরে তাহলে এটা দোফলা অর্থাৎ দ্বিগুণ সুরক্ষা দেবে।’’

অবশ্য, কাউলিং-এর মতে, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে এমন  মানুষ এবং সহজে আক্রান্ত হতে পারে এমন জলগোষ্ঠীর জন্য মুখোশের পর্যাপ্ত সরবরাহ সুনিশ্চিত করার পরেই কেবল সকলকে তা পরতে বলা উচিত।

অনুবাদ: যুধাজিৎ দাশগুপ্ত

Is the coronavirus airborne? Experts can’t agree শিরোনামে Dyani Lewis-এর এই লেখাটি বেরিয়েছিল নেচার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে, ২ এপ্রিল ২০২০ (doi: 10.1038/d41586-020-00974-w)



Saturday, April 4, 2020

নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে ভাইরাস!

নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে ভাইরাস!

 রবার্ট এফ সারভিস


করোনাভাইরাস। CDC / Alissa Eckert, MS, Dan Higgins, MAM. [Public domain image]





আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স (এন.এ.এস.) একটা অস্বস্তিকর ভাবনা উসকে দিল। এঁরা বলছেন, কেবল হাঁচি-কাশির সঙ্গে ছিটকে বেরনো অণুবৎ বিন্দু থেকে নয়, নয়া করোনাভাইরাস বাতাসে ভর করেও ছড়াতে পারে। যতটুকু গবেষণা হয়েছে তা থেকে নিশ্চিত কোনও বার্তা মিলছে না, কিন্তু হার্ভে ফাইনবার্গ লিখছেন, ‘‘যেসব পরীক্ষার ফলাফল হাতে এসেছে তাতে মনে হচ্ছে স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস যে এরোসলে রূপান্তরিত হয়েও সংক্রমিত হতে পারে তার সমর্থন মিলেছে।’’ এরোসল হল এমন ক্ষুদ্র কণা যা বাতাসে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকতে পারে। হার্ভে ফাইনবার্গ হলেন ‘ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যান্ড টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি হেলথ থ্রেটস’ নামে এক কমিটির প্রধান। ওপরের বার্তাটি তিনি পাঠিয়েছেন হোয়াইট হাউস অফিস অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পলিসি-র প্রধান কেলভিন ড্রোজেমেয়ারকে।

এতদিন অবধি আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সি.ডি.সি) এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যতত্ত্বাবধায়ক সংস্থাগুলো বলে আসছিল যে, সার্স-কভ-টু-র সংক্রমণের প্রাথমিক মাধ্যম হল অপেক্ষাকৃত বড় মাপের, ধরা যাক প্রায় ১ মিলিমিটার মাপের, অণুবৎ বিন্দু যা নাক-মুখ থেকে হাঁচি-কাশির সঙ্গে বেরিয়ে আসে। মাধ্যাকর্ষণের টানে এই বিন্দুগুলো দু-এক মিটার দূরত্ব পেরনোর আগেই মাটিতে পড়ে যায়। এ-ও ঠিক যে, যার ওপর বিন্দুগুলো পড়ে সেখান থেকে অন্য কারও হাতে লেগে যেতে পারে এবং নাকে মুখে বা চোখে হাত দেওয়ার মাধ্যমে সেসবের দ্বারাও সে মানুষটি আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু যদি সত্যিই ধরা পড়ে যে, করোনাভাইরাস নিশ্বাসের সঙ্গে অতি হালকা যে-বাষ্প বেরয় তার ভেতরেও ভেসে থাকতে পারে, তবে মানতেই হবে অন্যদের পক্ষে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা বেশ দুরূহ কাজ। এটা সত্যি হলে জনসমক্ষে আসা প্রত্যেকে মানুষেরই মুখ-ঢাকা মুখোশ পরার পক্ষে যে-দাবিটা উঠেছে, সেটাও তখন জোর পেয়ে যাবে। যার দেহে রোগের লক্ষণ তখনও ফোটেনি অথচ যে এই ভাইরাসের বাহক, অজান্তে তার দ্বারা সংক্রমিত হওয়া ঠেকানোর জন্য এই মুখোশ ধারণ জরুরি হয়ে উঠবে।

বিতর্কের শুরু যখন নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন এই বছরের গোড়ায় একটা গবেষণার ফলাফল বের করে। সেই গবেষণা বলছে, সার্স-কভ-টু এরোসল বিন্দু হয়ে ভেসে থাকতে পারে। ৫ মাইক্রনেরও ছোট এই বিন্দুগুলো বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে প্রায় ৩ ঘন্টা অবধি, এবং তাদের সংক্রামক চরিত্রও বজায় থাকে।

আরও একটি পরীক্ষার উল্লেখ করেছেন ফাইনবার্গ এবং এন এ এস-এর সতীর্থরা। তার একটা হল ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কা মেডিক্যাল সেন্টারের জোশুয়া সান্তারপিয়া এবং তাঁর সতীর্থদের কাজ। তাঁরা দেখেছেন, কোভিড-১৯ রুগীদের আলাদা করে রাখা এক ঘরের বাতাসে ভাইরাসের আরএনএ রয়েছে। রোগীদের থেকে দুই মিটারেরও বেশি দূরত্বের বাতাসে ভাইরাস আরএনএ পাওয়া গেছে, এমনকী সেটা মিলেছে ঘরের যেসব কোনায় সহজে কারও নাগাল পৌঁছয় না সেখান থেকেও। তাঁরা বলছেন, আরএনএ থাকার অর্থই হল, ভাইরাসটা এরোসল বেয়েও ছড়াতে পারে। যদিও সরাসরি সংক্রামক কোনও ভাইরাস-কণা তাঁরা সেখানে পাননি।

আর-একটা গবেষণা-ফলাফলের প্রাক-প্রকাশ সংস্করণ থেকে এন.এ.এস.-এর প্রতিবেদক গোষ্ঠী কিছু আশঙ্কার সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা দেখেছেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণগুলো (পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট, পি.পি.ই.) থেকেও সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের য়ুয়ান লিউ পরিচালিত এই গবেষকদল জানাচ্ছেন, স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন তাঁদের পি.পি.ই. খুলে রাখেন, মেঝে পরিষ্কার করেন বা সংক্রমিত এলাকার মধ্য দিয়ে যান তখন তাদের শরীর থেকে বাতাসে সংক্রামক ভাইরাস ফিরে ঢোকার সম্ভাবনা রয়ে যায়। এন.এ.এস. প্রতিবেদকদের মতে, সব কিছু মিলিয়ে ভাবলে, ‘‘হাঁচিকাশি থেকে বাতাসে ঠিকরে আসা অণুবৎ বিন্দু এবং এরোসল, উভয়ের ভেতরেই ভাইরাস-আরএনএ খুঁজে পাওয়ার অর্থ হল, এই পথেও ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে।’’

‘এরোসলাইজেশনের মতবাদটা যে গৃহীত হচ্ছে এটাই আমার কাছে একটা বড় স্বস্তি।’ বলেছেন কিম্বারলি প্রাথের, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান দিয়েগো-র এক রসায়নবিদ। সায়েন্সইনসাইডার-কে পাঠানো একটা ই-মেলে তিনি বলেছেন, ‘এই বায়ুবাহী মাধ্যমটাকে হিসেবে ধরার ফলে বুঝতে সুবিধে হবে যে কেন এই সংক্রমণটা এত দ্রুত ছড়াচ্ছে।’’

মুখোশ পরার যুক্তিটাও জোর পাচ্ছে এর দ্বারা। এন.এ.এস. প্রতিবেদক গোষ্ঠী, হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যান্সি লিউং এবং তাঁর সতীর্থদের লেখা একটা গবেষণাপত্রের উল্লেখ করেছেন। ভাইরাসের সংক্রমণে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হওয়া বেশ কিছু রোগীর হাঁচি-কাশি থেকে ছিটকে আসা অণুবৎ বিন্দু আর এই রোগীরা যে যেখানে আছেন তার বাতাসে ভাসমান পদার্থ এই গবেষকরা সংগ্রহ করেছিলেন। রোগীদের মধ্যে কয়েকজন সার্জিক্যাল মুখোশ পরেছিলেন। মুখোশ পরা থাকলে বাতাসে ভাসমান এরোসল এবং শ্বাসাঘাত-সৃষ্ট অণুবিন্দু দুটোতেই করোনাভাইরাসের আরএনএ কম পাওয়া গেছে। কিন্তু কেবল ইনফ্লুয়েঞ্জায় ভোগা মানুষদের হাঁচিকাশি নিঃসৃত অণুবিন্দুতেই এটা কম পাওয়া গেছে। গবেষকরা বলছেন, যাদের মধ্যে সংক্রমণের লক্ষণ ধরা পড়েছে তারা সার্জিক্যাল মুখোশ পরলে যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ আটকানো যেতে পারে তার স্বপক্ষে একটা কার্যকারণ-মানা প্রমাণ জোগাচ্ছে আমাদের পরীক্ষার ফলাফল।

এরোসল থেকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে এটা অবশ্য বিশেষজ্ঞদের প্রত্যেকে মানতে নারাজ। ২৭ মার্চ হু (ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন) একটা প্রতিবেদনে জানায়, কোনও কোনও বিশেষ অবস্থায় এরোসলের মাধ্যমে সংক্রমণ হয়তো বা সম্ভব, যেমন স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন কোনও মারাত্মক অসুস্থ রোগীকে শ্বাস-নল পরাচ্ছেন। কিন্তু, হু-বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, চিনের ৭৫০০০-এরও বেশি করোনাভাইরাস আক্রান্তের উদাহরণ থেকে বলা যেতে পারে, কোনও ক্ষেত্রেই বাতাসবাহী সংক্রমণের কোনও প্রমাণ নেই। বিজ্ঞানী সানন্তারপিয়া প্রমুখের গবেষণা প্রসঙ্গে এই বিশেষজ্ঞদের মত হল, পিসিআর যন্ত্র মারফত বাতাসের নমুনা বিশ্লেষণ করে ভাইরাসের আরএনএ খুঁজে পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, তাতে সংক্রমণ ঘটানোর যোগ্য ভাইরাস আছে।

তবে, এই বিতর্কের পর সি.ডি.সি. আপাতদৃষ্টিতে তাদের অবস্থানটাকে একটু ঝালিয়ে নিতে চলেছে। বেশ কয়েকটা সংবাদে প্রকাশ পেয়েছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আটকানোর জন্য এই সংস্থা আমেরিকার প্রত্যেককে জনসমক্ষে বেরনোর সময় মুখোশ পরার সুপারিশ করতে চলেছে।

অনুবাদ: যুধাজিৎ দাশগুপ্ত

-

২ এপ্রিল ২০২০ এই প্রতিবেদনটা You may be able to spreadcoronavirus just by breathing, new report finds শিরোনামে অনলাইন প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্সম্যাগ-এ। সায়েন্সম্যাগের প্রকাশক ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স’।



ভ্যাকসিন: বিভ্রম আর দুর্ভাবনা

  ভ্যাকসিন: বিভ্রম আর দুর্ভাবনা কৌস্তুভ পান্ডা   সমগ্র মনুষ্যজাতিকে যতরকম সাধারণ শত্রুর সঙ্গে লড়তে হয়েছে, তার কোনওটাই কোভিড-১৯-এর সঙ্গে ...