Wednesday, May 13, 2020

মহামারীর সুযোগে পরিবেশ-হননের ছাড়পত্র


মহামারীর সুযোগে পরিবেশ-হননের ছাড়পত্র
বৈষ্ণবী চন্দ্রশেখর


ছবি: যুধাজিৎ দাশগুপ্ত



ঠিক যে-সময়ে কোভিড-১৯ অতিমারীর কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে পরিবেশ-সুরক্ষার ওপর নজরদারি চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে, জরুরি সরেজমিন সমীক্ষাগুলোও চালানো যাচ্ছে না ঠিক, তখনই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পরিবেশ-পর্যালোচনার নীতিগুলোকে শিথিল করে বড় বড় শিল্পপ্রকল্পগুলোকে ছাড়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নিল। ভারতের পরিবেশবাদীরা এর বিরুদ্ধে সমালোচনায় সরব হয়েছেন।

‘‘সরকারের ভাবটা এমন যেন এই মুহূর্তে জনস্বাস্থ্য আদৌ কোনও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না, তারা এরই মধ্যে মিটিং ডাকছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বড় বড় প্রকল্পগুলো সমেত অন্যান্য উদ্যোগ সম্পর্কে’’, বলেছেন কাঞ্চী কোহলি, পরিবেশ-পরিচালন বিশেষজ্ঞ, ‘‘অথচ জনগণ যাতে ব্যাপারগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যাতে সরেজমিনে অবস্থা যাচাই করা যায়, তার সমস্ত সুযোগ আগে থাকতেই বন্ধ।’’ কাঞ্চী কোহলি সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এর সঙ্গে যুক্ত আছেন।

অতিমারীর প্রকোপ কমানোর জন্য ২৬ মার্চ থেকে ভারত কঠোর লকডাউন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু মিনিস্ট্রি অফ এনভায়রনমেন্ট, ফরেস্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ-এ কাজকর্ম চলেছে যথারীতি। সেখানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন প্যানেলের নানা বৈঠক সারা হয়েছে যাতে খনি, পরিকাঠামো আর শিল্পকারখানা গড়ার একঢাল প্রকল্পকে ছাড় দেওয়া যায়।  গত কয়েক মাসের মধ্যে এই মন্ত্রক একটা হস্তী সংরক্ষণ অরণ্যে নতুন কয়লাখনি খোঁড়ার ছাড়পত্র দিয়েছে, তৈলকূপের জন্য প্রাথমিক ড্রিলিং-এর অনুমতি বিলানো হয়েছে এমন জায়গায় যা  লায়ন-টেলড ম্যাকাক নামে বিপন্ন বানর আর গ্রেট ইন্ডিয়ান হর্নবিলের বাসভূমি। সেইসঙ্গে ছাড় পেয়েছে নয়াদিল্লির পার্লামেন্ট অঞ্চলটিকে ঢেলে সাজানোর বিতর্কিত পরিকল্পনাটি। আরও দুটো বিতর্কিত প্রকল্প নিয়ে এখন নাড়াচাড়া করা হচ্ছে: অরুণাচল প্রদেশের দিবাং ভ্যালি, যা বায়োডাইভার্সিটির ‘হটস্পট’, সেখানে একটা বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, আর মধ্য ভারতের একটা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ভেতর ইউরেনিয়াম খনি-প্রকল্প।

মন্ত্রকটি এইসঙ্গে ভারতের পরিবেশ সংক্রান্ত আইনের বেশ কয়েকটাকে ঢেলে সাজানোর দিকে এগোচ্ছে। বড় বড় প্রকল্প থেকে পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতি পর্যালোচনার ব্যাপারে একটা নতুন খসড়া নীতি পেশ করা হয়েছে এ বছর ২৩ মার্চ তারিখে। এই খসড়ায় আরও অনেক প্রস্তাবের সঙ্গে এটাও যোগ করা হয়েছে যে, পরিবেশ পর্যালোচনার ওপর জনসাধারণের মন্তব্য জানানোর জন্য বরাদ্দ সময় কমিয়ে দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, তারও বেশি সংখ্যক প্রকল্পকে একেবারে জনমতের মুখোমুখি হওয়ার প্রক্রিয়াটা থেকেই রেহাই দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর বিপক্ষ সমালোচকদের মত হল, এর ফলে যেসব প্রকল্প পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই কাজ শুরু করেছে তাদের প্রকারান্তরে অনুমতি দিয়ে দেওয়া হল।

মন্ত্রক থেকে প্রথমে জনসাধারণকে মন্তব্যের জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল ৬০ দিন। তবে বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী অতিমারীর কারণে এই প্রক্রিয়াটি স্থগিত রাখার দাবি তোলে। পরিবেশ মন্ত্রক ৩০ জুন অবধি মতামত পেশের সময়সীমা বর্ধিত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে অতিমারী চলার মধ্যেই সরকারের তরফে শিল্পোদ্যোগের প্রকল্পগুলোকে এভাবে ঠেলে পার করে দেওয়ার চেষ্টাটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাণিজ্যমহল-ঘেঁষা অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন, লিগ্যাল ইনিশিয়েটিভ ফর ফরেস্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সংস্থার বিশ্লেষণে ধরা পড়েছে, ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি এবং পার্কগুলির তত্ত্বাবধায়ক একটি বিশেষ প্যানেল ২০১৯-এর জানুয়ারি থেকে জুনের ভেতর ৭০টা উন্নয়ন প্রকল্পের ৬৩টাকেই ইতিমধ্যে ছাড় দিয়েছে, পরিণামে ২১৬ হেক্টর আয়তন প্রাকৃতিক ভূমিতে সংরক্ষণের অবনতি ঘটেছে। কোহলি উল্লেখ করেছেন, এই প্যানেলের মধ্যে কেবল মাত্র একজনই বিজ্ঞানী আছেন যিনি স্বাধীন। শ্রীমতী কোহলির মতে, ‘‘নানারকম দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারা কয়েক বছর হল ক্ষীণ হয়ে এসেছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘প্রধান লক্ষ্য এখন ছাড় পাইয়ে দেওয়া, অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ বা মতবিনিময় চালু করা নয়।’’

কনজারভেশনিস্ট এবং বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, দিবাং ভ্যালি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বেলাতেও উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য পাবে। ৩০৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম এই প্রকল্পটির জন্য প্রস্তাবিত জলাধারটি যেখানে তৈরি হবে সেখানে ৩০০ প্রজাতির পাখি, ৭৫টি প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাস। এখানকার অধিবাসী ইদু-মিশমি উপজাতির মানুষেরা এই প্রকল্পটির বিরোধিতা করছেন। এই অঞ্চলে এর আগে সরকারের তরফে একটা পরিবেশ-বিনাশ সম্ভাবনার পর্যালোচনা করা হয়েছিল। এই অঞ্চলে যেসব বিজ্ঞানী গবেষণা করছেন তাঁরা সেই প্রতিবেদনটিকে খুঁটিয়ে দেখেছেন। তাঁদের সুপারিশ হল, এখানে আরও বড় মাপে একটা পর্যালোচনা হওয়া উচিত, যা এই বাঁধটি এবং এটির মতো এখানে আরও যেসব বাঁধের পরিকল্পনা করা হয়েছে সেগুলো কীভাবে পরিবেশের ওপর কুপ্রভাব ফেলতে পারে তার অনুসন্ধান করবে। অরণ্যের দেখভাল ও পরিচালনার ব্যাপারে এখানকার ভূমিপুত্রদের মতামতকে আরও বেশি করে গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারে এই বিজ্ঞানীরা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছেন। এই বিজ্ঞানীদের একটি গোষ্ঠী অরণ্য বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটিকে গতমাসে একটি লিখিত আবেদনে জানিয়েছে,  ‘‘আমাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ, এই দিকটাও ভেবে দেখুন’’, যাতে ‘‘এই নজিরবিহীন সামাজিক আর প্রাকৃতিক সংকটের মুহূর্তে ভারত আবার সত্যিকারের ইকোলজিকাল চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকে পথ দেখাতে পারে।’’

অনুবাদ: যুধাজিৎ দাশগুপ্ত

---------------
প্রতিবেদনটি ‘সায়েন্স’ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ‘‘India’s push to relax environmental assessment rules amid pandemic draws criticism’’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল ৭ মে ২০২০ তারিখে। doi:10.1126/science.abc6828 



Tuesday, April 7, 2020

কোন মুখোশ নিরাপদ?






কোন মুখোশ নিরাপদ?

ম্যান্ডি ওকল্যান্ডার



আমার যদি করোনা-আক্রান্ত হওয়ার কোনও লক্ষণ না থাকে তাহলেও কি মুখোশ পরা উচিত? এই প্যানডেমিকের নানা সময়ে এই কথাটাই বারে বারে ঘুরেফিরে এসেছে। এতদিন পর্যন্ত এর উত্তরটাও ছিল সরল, অন্তত যদি আমরা আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর কথা মেনে চলি।  ৩ এপ্রিল পর্যন্ত সিডিসি এই প্রশ্নের উত্তরে বলছিল: না, মুখোশ পরার দরকার নেই।...

কিন্তু মাস্ক সম্পর্কে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে এখন। ৩ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাধারণ মানুষকে সিডিসি-র নির্দেশ অনুসারে নন-মেডিক্যাল মাস্ক পরতে বলেছেন। বাড়ি থেকে যদি বেরতেই হয়, যেমন ধরা যাক দোকান-বাজার করতে, তবে মাস্ক পরা জরুরি।  নন-মেডিক্যাল মাস্ক মানে হল নাক ও মুখ ঢাকা কাপড়ের মুখোশ। মাথায় বাঁধা ফেট্টি, যাকে ইংরেজিতে বলে ব্যানডানা, এবং টি-শার্ট তৈরি হয় যে-কাপড়ে সেরকম কিছু দিয়ে বানানো। এই সাবধানতা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক।...

২৬ মার্চ আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ-এর ডিরেক্টর অ্যান্টনি ফসি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘আমরা যখন বলছিলাম যে আপনার মুখোশ পরার দরকার নেই তখন আমরা আসলে বলতে চাইছিলাম মুখোশ পরার প্রয়োজন কার বেশি সেটা বুঝে নিয়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মুখোশ পরা উচিত। কোনও আদর্শ পৃথিবীতে, যেখানে যত চাই তত মুখোশ মেলে, সেখানে কেউ মুখোশ পরে রাস্তায় হাঁটলে আমার কোনও আপত্তি থাকতে পারে না। ওটার মাধ্যমে আপনি তো কিছুটা বেশি সুরক্ষা পেতেই পারেন।’’

প্রশ্ন হল, মাস্ক কি সত্যিই নীরোগ মানুষকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে? একটা টি-শার্টের কাপড় কি আমাকে রোগের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে? উত্তরগুলো নিয়ে কিছু জটিলতা আছে, সবটা এখনও বোঝা যায়নি। চিকিৎসকরা এবং মাস্কের উপযোগিতা নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁরা কী বলছেন দেখা যাক।

বিজ্ঞানীরা জানেন, নয়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, কিন্তু রোগের কোনও লক্ষণ তখনও যার মধ্যে ফোটেনি এমন মানুষেরাও সংক্রমণ ছড়াতে পারেন। (এ কথাটা রোগটা যখন দেখা দিল তখন জানা ছিল না।) সিডিসি-র ডিরেক্টর রবার্ট রেডফিল্ড সম্প্রতি এক সংবাদমাধ্যম, এনপিআর-কে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সংক্রমিত মানুষদের শতকরা ২৫জনের ভেতর রোগের কোনও লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে। যাদের শরীরে রোগের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে তারাও ওই লক্ষণ দেখা দেওয়ার দুদিন আগে থাকতেই সম্ভবত রোগটা ছড়াতে থাকেন। ‘‘রোগটা কীভাবে দেশের ভেতর এতদূর ছড়িয়েছে তার একটা কারণ বোধহয় পাওয়া যাচ্ছে এখান থেকে।’’ বলেছেন রেডফিল্ড।

রোগটার এমন নীরব পদসঞ্চারের ফলে বাইরে বেরনো সমস্ত সাধারণ মানুষের মুখোশ পরার স্বপক্ষে যুক্তিটাই ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে, কারণ কে যে সংক্রমিত আর কে যে নয় তা বোঝা যাচ্ছে না।...

দুটো মতবাদেরই – অর্থাৎ এক, প্রত্যেক  সাধারণ মানুষেরই মুখোশ পরা দরকার, আর দুই, সমস্ত আমআদমির মুখোশ পরার দরকার নেই – দু’পক্ষেরই যথেষ্ট গোঁড়া সমর্থক মজুত আছে।  প্রথম দলে যাঁরা, তাঁরা দেখাচ্ছেন যে, ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগাক্রান্ত মানুষদের থেকে রেহাই পেতে মুখোশ ব্যবহারের সুফল আছে – তা সে সুফল যত সামান্যই হোক না কেন, আর তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণও আছে।

দ্বিতীয় দলে যাঁরা আছেন, তাঁরা মনে করেন, বৈজ্ঞানিক সাবুদ যা মিলছে তাতে পথেঘাটে মুখোশের কার্যকারিতাকে এমন মনে হচ্ছে না যে, প্রত্যেককে তা পরতে বলাটা যৌক্তিক কাজ হবে। বরং, ওটা পরে থাকলে লোকের মনে একটা ভ্রান্ত নিরাপত্তার ভাব তৈরি হতে পারে, তারা হয়তো অকারণ সাহসী হয়ে যেসব বিধিনিষেধ আসলে জরুরি এবং কার্যকর, সেগুলোকেই অগ্রাহ্য করতে থাকবে – যেমন, প্রত্যেকের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করে চলা। তাঁরা আরও মনে করেন যে, মুখোশ পরা অবস্থায় তারা হয়তো অজান্তেই অনেক বেশি করে মুখে হাত দেবেন।

কানাডার সংক্রামক রোগের গবেষক-চিকিৎসক আইজাক বোগোচ বলছেন, ‘‘আমার মনে হয় আমাদের বেশ একটু সততার সঙ্গে স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে, কিছু কিছু প্রমাণ থেকে ইঙ্গিত মিলছে, মাস্ক পরার সম্ভাব্য সুফল আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে বেশ কিছু সতর্কতার অবকাশও জুড়ে আছে। ... এটা ভীষণ সত্যি যে, মাস্ক পরা বহু মানুষের বেলাতেই সেটা পরার যে-সুবিধে তা নষ্ট হবে যদি সে ভুল ধরনের মাস্ক পরে, কিংবা ধরা যাক যদি সে মাস্কটা ঠিকঠাক করে বসানোর জন্যই বারবার মুখে হাত ঠেকায়। যে মানুষটা দূরত্ব রাখার সব নিয়মকানুন ঠিকঠাক মানছে, যে অন্তত ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখছে অন্য মানুষেোর থেকে, তার বেলা মুখোশ পরাটা অতিরিক্ত কোনও সুবিধে দেবে না।’’

আমেরিকায় প্রয়োজনীয় মাস্কের  সরবরাহ এত কম যে স্বাস্থ্যকর্মীরাই করোনাভাইরাস রোগীদের সঙ্গে কাজ করার মতো পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইউনিট (পিপিই) পাচ্ছে না। তার মধ্যে আছে এন-৯৫ রেস্পিরেটর (শক্ত করে মুখে আঁটা যায় এমন একটা মুখোশ তাতে হাঁচি-কাশি থেকে ছিটকে বেরনো অণুবিন্দু, যাতে ভাইরাস ব্যাকটিরিয়া লেগে থাকতে পারে, আটকে যায়। কিন্তু খুব সূক্ষ্ম কিছু আটকায় না)।

‘‘আমরা জানি যে, যারা স্বাস্থ্যপরিষেবা দিচ্ছে তাদেরই সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেক বেশি, মানে, যে ধরনের কাজ এদের করতে হয় বা যে ধরনের রোগীদের নিয়ে করতে হয় তার ভিত্তিতে বলছি।’’ বলেছেন ড. এরিকা শেনয়, তিনি ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের ইনফেকশন কন্ট্রোল ইউনিটের অ্যাসোসোসিয়েট চিফ। মুখোশের ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে যখন হাত ধোওয়া, চোখ সুরক্ষিত রাখা, গ্লাভস আর গাউন পরা এইসব সতর্কতা পালন করা হয়, তখন স্বাস্থ্যকর্মীরা সত্যিই সুস্থ থাকতে পারেন, যেমন সুস্থ থেকেছেন কোভিড-১৯ রোগীদের সঙ্গে কাজ করার সময়।

মুখোশের টানাটানির দরুন আমেরিকা সরকার সাধারণ নাগরিকদের যে মুখোশ পরতে বলছেন তা এন-৯৫ বা সার্জিক্যাল মাস্ক নয়, বরং ঘরে বানানো মুখোশ। তবে, যদি একসময় টানাটানি মিটেও যায়, সকলে মুখোশ পরতেও পারে, তাতে সুরক্ষা আদৌ আসে কি না সেটাও জেনে নেওয়া দরকার।

আমাদের শ্বাসব্যবস্থাকে আক্রমণ করে এমন ভাইরাস আটকাতে সার্জিক্যাল মাস্ক কতটা কার্যকর তা নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে। ‘‘এগুলোতে ধরা পড়েছে যে, অল্প কিছু সুফল এর সত্যিই আছে এবং মাস্ক পরার তেমন কোও ক্ষতিকর প্রভাবও নেই।’’ বলেছেন অ্যালিসন আয়েলো, ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলিনাতে এপিডেমিওলজির অধ্যাপক। ২০১০-এ মুখোশের উপযোগিতা সংক্রান্ত একটা গবেষণাপত্রের তিনি সহলেখক। তাঁর করা একটা গবেষণার ফলাফল দেখাচ্ছে, ফ্লু চলছে এমন এক সময়ে কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ওপর মাস্ক পরার তেমন কার্যকারিতা এমনিতে দেখা যায়নি, সুফল দেখা গেছে যখন মাস্ক পরার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম মেনে তারা হাতও ধুয়েছে।

২০০৯-এ প্রকাশিত আর-একাট গবেষণা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায়। ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগে আক্রান্ত বাচ্চাদের দেখাশোনা করার সময় পরিবারের সদস্যরা যখন নিয়ম করে মুখোশ পরেছেন, দেখা গেছে তাঁরা নিজেরা কম আক্রান্ত হয়েছেন।

সিডিসি সম্প্রতি জানিয়েছে, চিকিৎসা-মানের মাস্ক যদি না পাওয়া যায় তাহলে স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরে তৈরি মুখোশ ব্যবহার করতে পারে, যেমন মাথায় বাঁধা ফেট্টি অর্থাৎ  ব্যানডানা এবং স্কার্ফ। ‘‘অবশ্যই ঘরে তৈরি মাস্ককে পিপিই বলা চলবে না, কারণ সেগুলো কতটা সুরক্ষা দেয় তা এখনও অজানা।’’ এরকম জিনিস ব্যবহার করার সময় অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

ঘরে তৈরি মাস্ক আদপে নিরাপদ কি না তা নিয়ে ২০১৩য় একটা সমীক্ষা হয়েছিল। গবেষকরা ঘরেই মেলে এমন নানা কিছু দিয়ে মুখোশ বানিয়ে দেখছিলেন সেগুলো ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস যুক্ত এরোসল (বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম কণা) কতটা আটকাতে পারে, এবং  সেই জিনিস দিয়ে বাস্তবে ব্যবহারোপযোগী মুখোশ কীভাবে বানানো যেতে পারে। তাঁদের পরীক্ষিত জিনিসগুলোর মধ্যে ছিল সুতির টি-শার্ট, স্কার্ফ, চা-পানের সময় ব্যবহৃত ছোট তোয়ালে, বালিশের ওয়াড়, ভ্যাকুয়াম ক্লিনারে ব্যবহৃত থলে। তাঁরা দেখলেন, সবথেকে কার্যকর মুখোশ বানানো যায় ১০০%  সুতির টি-শার্ট দিয়ে কিংবা বালিশের ওয়াড় দিয়ে। তবে, টি-শার্টের কাপড়ের স্ট্রেচি-ভাবের কারণে তা দিয়ে বানানো মুখোশটা পরতে সুবিধে হয়। স্বেচ্ছাকর্মীরা টি-শার্ট দিয়ে নিজেরাই মুখোশ বানিয়ে (কীভাবে বানানো যায় তার উপায় দেখানে আছে এই রচনায়) তার মধ্য দিয়ে কেশে দেখছিলেন সেটা কেমন কাজ করে। তুলনার জন্য একইভাবে কাশির ফলাফল দেখা হয়েছিল সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করে এবং কোনও মাস্ক ছাড়াই। দেখা গেছে ছোট ছোট সংক্রামক কণা আটকানোর কাজে টি-শার্ট দিয়ে বানানো মাস্ক সার্জিক্যাল মাস্কের মাত্র তিন ভাগের একভাগ কার্যকর।... ‘‘কিছু না থাকার চেয়ে এটা থাকা ভাল’’, বলেছেন আনা ডেভিস, এই গবেষকদলের একজন, তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর।  

... তবে ঘরে তৈরি মাস্কে যে হিতে বিপরীত হতে পারে তেমন সম্ভাবনাও দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় করা এক গবেষণায় দেখা গেছে মাস্ক ব্যবহারকারীরা যতটা নিয়ম মেনে তাদের মাস্কগুলো ধোয়ার কথা ছিল তেমনটা করেননি। রায়না ম্যাকইনটায়ার, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলসের অধ্যাপক এবং উপরোক্ত গবেষণার সহযোগী, বলছেন, ‘‘আমরা জানতে পেরেছি মাস্কগুলো ভীষণ স্যাঁতসেঁতে, ভিজে ভিজে হয়ে পড়ে।’’ এবং ‘‘ভিজেভাবের কারণে সেখানে রোগজীবাণু বাড়তে থাকে। কাজেই লোকেরা যদি সেটা ঠিকঠাক না ধুয়ে ব্যবহার করে চলে তাহলে সংক্রমণের সম্ভাবনা তো থেকেই যায়। সাধারণ মানুষ যদি ঘরে তৈরি মাস্ক ব্যবহার করতেই চায় তাহলে তাতে একাধিক স্তর রেখে বানানো ভাল, এবং এমন কাপড় ব্যবহার করা উচিত যা জল টানে না।
ব্যাপারটা এখনও অপরিষ্কার, কিন্তু আইয়েলো বলছেন, ‘‘কাপড়টা যেহেতু কিছুটা হলেও রোগ-ছড়ানো অণুবিন্দু ঠেকাতে পারে, কাজেই অন্তত খাতায়-কলমে ওই আড়ালটা সঙ্গে রাখাই ভাল, তাতে কোনও কোনও পরিস্থিতিতে কিছু কিছু সংক্রমণ তো আটকানো যেতেই পারে।’’

‘‘মুখোশ যদি পরতেই চাও তো পরো,’’ বোগোচ বলছেন, ‘‘কিন্তু এ থেকে সম্ভাব্য কী উপকার পাওয়া সম্ভব সেটা যেমন মনে রাখতে হবে তেমনই এর সীমাবদ্ধতাগুলো কী কী, জানতে হবে সেটাও। আর বাস্তববোধটাকে সজাগ রাখতে হবে।’’

অনুবাদ: যুধাজিৎ দাশগুপ্ত

ShouldHealthy People Wear Masks to Prevent Coronavirus? The Answer May Be Changing শিরোনামে এই রচনাটা বেরিয়েছে ৩ এপ্রিল ২০২০, টাইম পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে। এখানে তার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ আছে

Monday, April 6, 2020

মুখোশ পরব, কি পরব না

মুখোশ পরব, কি পরব না

ডিয়ানি লিউয়িস


বাইরে বেরলেই মুখোশ পরা জরুরি কিনা তা নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করছে বহু দেশ [Pic:newsbharati.com]






















করোনাভাইরাস কি বাতাস বেয়ে সংবাহিত হতে পারে? ক’দিন আগে থাকতেই, যখন থেকে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে যে, মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে, গবেষকরা এটার উত্তর খুঁজে চলেছেন। স্বাস্থ্য অধিকর্তারা বলছেন এটা কেবল কাশি বা হাঁচির সঙ্গে ছিটকে বেরনো অণুবিন্দু মারফতই প্রবাহিত হয় - হয় সরাসরি, নয় কোনও বস্তুতে লেগে থেকে। কিন্তু বেশ কিছু বিজ্ঞানী বলছেন, বাতাস মারফত করোনাভাইরাস সংবাহিত হওয়ার প্রাথমিক প্রমাণও মিলেছে। আমাদের নিশ্বাসবায়ুতে মিশে থাকা অনেকগুণ সূক্ষ্মতর কণা, যাকে বলে এরোসল, তার মধ্য দিয়েও এটা ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদি সাবধানতা অবলম্বন করা যায়, যেমন ঘরের ভেতর বায়ু চলাচল বাড়ানো, তবে সংক্রমণের আশঙ্কা কমানো যেতে পারে।

২৭ মার্চ তারিখে একটা বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (হু) জানিয়েছে, সার্স-কভ-টু-র বায়ুবাহিত ভাইরাস, এমন মতের স্বপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ কিছু নেই। চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার কিছু বিশেষ অবস্থায়, যেমন যখন সংক্রামিত রোগীকে কোনও টিউব পরানো হচ্ছে, তেমন সম্ভাবনা অবশ্য থেকে যেতে পারে।

যে-বিশেষজ্ঞরা বায়ুবাহিত শ্বাসঘটিত ব্যাধি এবং এরোসলের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন তাঁরা বলছেন, করোনাভাইরাসের বায়ুবাহিত চরিত্রের সর্বজনগ্রাহ্য প্রমাণ জোগাড় করতে কয়েক বছর হয়তো লেগে যাবে, আর তার মাঝখানে হয়তো বহু প্রাণ বিনষ্ট হবে। ‘‘নিখুঁত প্রমাণ পাওয়ার তাগিদ যেন ব্যাপারটা সম্যক বুঝে নেওয়ার পথে কাঁটা হয়ে না দাঁড়ায়,’’ বলেছেন মাইকেল ওস্টারহোলম, মিনিয়াপোলিসের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ইনফেকশাস-ডিজিজ এপিডেমিওলজিস্ট।

‘‘যে-বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে কাজ করে চলেছেন তাঁদের মনের মধ্যে তিলমাত্র সন্দেহ নেই যে ভাইরাসটা বাতাস বেয়ে ছড়ায়’’, বলছেন লিডিয়া মোরাওস্কা, অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে কুইনসল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির এরোসল সায়েন্টিস্ট।

জনস্বাস্থ্য আধিকারিকরা যখন বলছেন যে, কোভিড-১৯ বায়ুবাহিত এমন কোনও প্রমাণ নেই, তখন তাঁরা বোঝাতে চাইছেন ভাইরাস-মাখা কিছু কণা যেগুলোর মাপ ৫ মাইক্রোমিটারেরও কম, যাকে বলে এরোসল, সেসবের বাতাসে ভেসে পরিবাহিত হওয়ার কথা। যেসব বিন্দু তুলনায় বড়সড়, সেগুলো কারও হাঁচি বা কাশি থেকে বেরিয়ে এসে সামান্য গিয়েই মাটিতে বা অন্য কোনও বস্তুর ওপর পড়ে আটকে যায়, এটাই সাধারণ ধারণা। ওদিকে এরোসলগুলো বাতাসে ভেসে থাকতে পারে এবং অনেকদূর অবধি যেতে পারে।

বেন কাউলিং হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এপিডেমিওলজিস্ট। তাঁর মতে, বেশিরভাগ সংক্রমণই খুব কাছাকাছি পাল্লার মধ্যে ঘটে। কিন্তু অণুবিন্দু আর এরোসলের মধ্যে ফারাক করলে খুব একটা লাভ হবে না। কেননা, ‘‘ভাইরাস সঙ্গে নিয়ে যেসব কণা বেরিয়ে আসে সেগুলো নানা মাপের হয়। বড়, খুব বড় থেকে একেবারে এরোসলের মতো সূক্ষ্ম কণা অবধি।’’

আর, সার্স-কভ-টু যদি এরোসল পরিবাহিত হতে পারে তবে এ-ও খুবই সম্ভব যে, আবদ্ধ জায়গায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ক্রমশ জমে উঠতে পারে কিংবা অনেকদূর অবধি পরিবাহিত হতে পারে।

কথা বলা বা নিশ্বাস ছাড়ার সময়েই এরোসলগুলো বেশি করে তৈরি হয়। কাজেই তা হাঁচি বা কাশির থেকেও বেশি বিপজ্জনক। এই মত ব্রিটেনের ইউনিভার্সিট অফ লেস্টার-এর ভাইরোলজিস্ট জুলিয়ান ট্যাং-এর: ‘‘কেউ যখন কাশে, বা হাঁচি দেয়, তখন একটু মুখ ফিরিয়ে নেয়।’’ কিন্তু আমরা যখন কথা বলি বা নিশ্বাস ছাড়ি তখন তো সেটা আর করি না।

ইনফ্লুয়েঞ্জা-আক্রান্ত মানুষদের নিয়ে করা কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে রোগীদের ৩৯ শতাংশই সংক্রামক এরোসল ত্যাগ করছে। আমরা যখনই কারও সঙ্গে একই বাতাসে নিশ্বাস নিই, তারা যে বাতাস ত্যাগ করছে সেটাই আমরা শ্বাসের সঙ্গে টেনে নিই, তখনই বাতাসবাহী সংক্রমণ সম্ভব হয়ে ওঠে।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষেত্রসমীক্ষা থেকে এরোসল বেয়ে সার্স-কভ-টু ছড়ানোর স্বপক্ষে মিশ্র প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। চিনের উহানে যখন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব তুঙ্গে, তখন উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট কে. ল্যান, কোভিড-১৯-এর রোগীরা চিকিৎসাধীন রয়েছে এমন হাসপাতাল থেকে এরোসলের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। সেইসঙ্গে এরোসল নিয়েছিলেন দুটো জমজমাট ডিপার্টমেন্ট স্টোরের প্রবেশপথ থেকেও।

ল্যান এবং তাঁর সতীর্থদের লেখা একটা রিপোর্ট (প্রাক-মুদ্রণ অনলাইন প্রকাশ, রিভিউ হয়নি সেটার) বলছে, তাঁরা বেশ কয়েকটি জায়গা থেকে সার্স-কভ-টু-র আরএনএ পেয়েছেন, ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলো থেকেও।

তবে এই পরীক্ষাগুলোয় নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে না এইসব সংগৃহীত এরোসল আমাদের কোষে সংক্রমণ ঘটাতে পারে কিনা। ‘নেচার’ পত্রিকাকে লেখা এক ই-মেলে ল্যান জানিয়েছেন যে, এই গবেষণা দেখাচ্ছে, ‘‘কথা বলা বা শ্বাস ছাড়ার সময় এরোসলের মধ্য দিয়ে সার্স-কভ-টু-র সঞ্চার  সম্ভব হলেও হতে পারে, এবং উৎস থেকে কাছে বা দূরে থাকা মানুষের ওপর তার প্রভাবও পড়তে পারে।’’ সাবধান থাকার জন্য সাধারণ মানুষের পক্ষে ভিড় এড়িয়ে চলাই উচিত হবে, তিনি বলেছেন। এবং সবসময় মুখোশ পরা উচিত, যাতে ‘‘বায়ুবাহিত ভাইরাস থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।’’

সিঙ্গাপুরে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের অস্থায়ী আবাসে যেসব আইসোলেশন রুম ছিল তার বাতাসে সার্স-কভ-টুর সন্ধান করেছিল আর-একটা সমীক্ষা। সেখানে বাতাস বেরনোর পথে রাখা একটা পাখার গা থেকে ভাইরাসটির উপস্থিতি মিলেছিল। তবে, ওই সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত দুজন গবেষক, সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিজের কালীশ্বর মরিমুথি এবং উন টেক এং, নেচার পত্রিকাকে পাঠানো এক ই-মেলে জানিয়েছেন যে, একজন রোগী ওই পাখাটার এত কাছাকাছি ছিলেন যে তাঁর হাঁচি-কাশি থেকে ছিটকে আসা অণুবিন্দু থেকেও সেটা ঘটে থাকতে পারে। 

নেব্রাস্কায় আর-এক গবেষকদল তাঁদের সংগৃহীত বাতাসের দুই-তৃতীয়াংশ নমুনায় ভাইরাসের আরএনএ পেয়েছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে কোভিড-১৯-এ মারাত্মক রকমে আক্রান্ত মানুষদের এবং সেইসঙ্গে বিভিন্ন কোয়ারান্টিনে হালকা আক্রান্ত মানুষদের যেসব আইসোলেশন রুমে রাখা হয়েছিল সেখান থেকে বাতাস নিয়েছিলেন তাঁরা। বাতাস ঢোকা-বেরনোর পথে যে-জাফরি রাখা ছিল তার গা থেকেও মিলেছে ভাইরাসের লক্ষণ। তবে সেসব জায়গা থেকে পাওয়া কোনও নমুনাই মানুষের কোষকে সংক্রমিত করতে পারেনি। কিন্তু পরীক্ষার মাপজোখ বলছে, ‘‘কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের দ্বারা ভাইরাল এরোসল নিঃসরণ সম্ভব, এমনকী কাশি না থাকলেও’’, বলেছেন এই গবেষকরা।

হু যে বৈজ্ঞানিক বিবৃতি জারি করেছে তার বক্তব্য হল, এখনও অবধি প্রাপ্ত ভাইরাসের আরএনএ-র নমুনা ‘থেকে বলা যাচ্ছে না যে তাতে সক্রিয় ভাইরাস আছে এবং তা সংক্রমণ ঘটাতে পারে।’’ সেই বিবৃতিতে চিনে তাঁদের নিজেদের তরফে ৭৫০০০ কোভিড-১৯ রোগীর ওপর চালানো সমীক্ষার কথাও আছে, বলা হয়েছে ওতে তাঁরা বায়ুবাহিত সংক্রমণের কোনও প্রমাণ পাননি। বেন কাউলিং বলছেন, ‘‘(হু-র দেওয়া) এই অ্যাসেসমেন্টের স্বপক্ষে দাঁড় করানোর মতো তেমন যথেষ্ট প্রমাণ কিন্তু এতে নেই’’, এবং প্রমাণ মিলছে না বলে এও ধরে নেওয়া যায় না যে সার্স-কভ-টু বায়ুবাহিত নয়। এই অপ্রতুল প্রমাণের যাথার্থ্য সম্পর্কে নেচার-এর তোলা প্রশ্নের কোনও উত্তর  হু পাঠায়নি অন্তত এই লেখা প্রকাশিত হবার আগে অবধি।

আমেরিকার বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এই ভাইরাসটা এরোসলে ভাসমান থাকতে পারে এবং তার সংক্রামক চরিত্রও বজায় রাখতে পারে কম করে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত। যে-পরিবেশে  ওই পরীক্ষা করা হয়েছিল সেটা অবশ্য ‘অতিমাত্রায় কৃত্রিম’। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘বাতাস মারফত দূরপাল্লার সংক্রমণ সম্ভাবনা একেবারে শূন্য নয়’’, বলেছেন লস এঞ্জেলেস-এ ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সংক্রামক ব্যাধি গবেষক জেমি লয়েড-স্মিথ। তিনি এই গবেষণার অন্যতম সহকারী।

সার্স-কভ-টু-কে বায়ুবাহিত বলে মেনে নেওয়ার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে বলে মনে করেন না লিও পুন, হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট। এমন কিছু পরীক্ষা করা দরকার বলে তিনি মনে করেন যার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে এইসব বিভিন্ন মাপের অণুবিন্দুতে থাকা ভাইরাস সত্যিই রোগ ঘটায়।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের নাক-মুখ থেকে শঙ্কিত হবার মতো মাত্রায় ভাইরাস-পৃক্ত এরোসল বেরয় কি না সেটাও একটা প্রশ্ন, বলছেন লয়েড-স্মিথ। তিনি বলছেন, এই মানুষেরা যখন কথা বলছে, শ্বাস ছাড়ছে, হাঁচি বা কাশি হচ্ছে তাঁদের, তখন বাতাসের নমুনা নেওয়া দরকার, এবং পরীক্ষা করে দেখা দরকার তাতে সত্যিই সংক্রমণ-ক্ষম ভাইরাস আছে কিনাআর এসব কাজই ‘‘এই ধাঁধাটার আর-একটা বড় অংশ।’’ এরকম একটা পরীক্ষায় কোভিড-১৯ আক্রান্ত এক রোগী - যিনি কথা বলছেন, নিশ্বাস ছাড়ছেন, কাশছেন, তাঁর ১০ সেন্টিমিটার দূর থেকে বাতাসের নমুনা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেই পরীক্ষা থেকে ভাইরাসের আরএনএ-র অস্তিত্ব মেলেনি বটে, কিন্তু গবেষকরা বায়ুবাহিত ভাইরাস সংবহনের সম্ভাবনাকে একেবারে খারিজ করেও দেননি।

আর একটা জরুরি খুঁটিনাটি যেটা এখনও অজানা তা হল, ‘ইনফেকশাস ডোজ’ - কী মাত্রায় ভাইরাস থাকলে তা থেকে সংক্রমণ ঘটতে পারে, বলছেন লয়েড-স্মিথ। অর্থাৎ রোগ ঘটানোর জন্য কতগুলো সার্স-কোভ-টু কণা লাগে? ‘‘নিশ্বাসের সঙ্গে যে এরোসল-রূপী ভাইরাস বেরয় তার ইনফেকশাস ডোজ কত, কী মাত্রায় এলে সংক্রমিত হওয়ার পর্যাপ্ত সম্ভাবনা থাকে সেটা আমরা এখনও জানি না।’’ মাত্রাটা কী তা জানার জন্য পরীক্ষা সাজানোর একটা দায় আছে, জেনেবুঝে মানুষকে নানা মাত্রার আবহে রেখে প্রতি ক্ষেত্রে সংক্রমণের হার বের করা - এটা একটা অনৈতিক কাজ। বিশেষ করে আমরা যেখানে এ রোগের করাল চরিত্রটা জানি।

ট্যাং একটা ভিন্ন প্রসঙ্গ তুলেছেন। তিনি বলছেন, সংক্রমণ ঘটানোর জন্য পর্যাপ্ত মাত্রাটা যাই হোক না কেন, আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, কতক্ষণ ধরে একজন সেই পরিবেশে থাকছে। একবারের নিশ্বাসে হয়তো তেমন ভাইরাস বেরয় না, কিন্তু ‘‘তুমি যদি (আক্রান্ত কোনও ব্যক্তির) পাশে থাকো, একই বাতাসে শ্বাস নাও ৪৫ মিনিট ধরে, তাহলে সংক্রমিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভাইরাস তোমার মধ্যে ঢুকবে।’’

কিন্তু ক্রমান্বয়ে জমে জমে সংক্রমণ ঘটানোর মাত্রায় পৌঁছতে পারে এমন সামান্য পরিমাণ এরোসল সংগ্রহ করা – আর সেটাও সঠিক বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা আর তাপমাত্রার মিশেল মেনে, ‘এক চরম কঠিন কাজ’, বলেছেন মোরাওস্কা। ‘‘আরও ডেটা দরকার সেটা তো বলাই যায়, কিন্তু সেটা জোগাড় করা যে খুব কঠিন তাও স্বীকার করতে হবে।’’
ট্যাং বলছেন, বাতাস বেয়ে এই সংক্রমণ ছড়ায় সেটাই ধরে এগোনোই ভালো – যদি না পরীক্ষায় সেটাকে ভুল প্রমাণ করা যায়। কিন্তু উল্টোটা ধরে এগোনো ঠিক হবে না। মানুষ তাহলেই সাবধান থাকতে পারবে, নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করবে।

মোরাওস্কা বলছেন, ঘরের ভেতরকার বায়ু চলাচল বাড়ানো দরকার আর একই বাতাস ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করাটা কমানো দরকার। তাহলেই ভেতরকার বাতাসে এরোসলের ঘনত্ব কিছু কমানো সম্ভব, ঝেঁটিয়ে বের করে দেওয়া সম্ভব। সাবধানের মার নেই, কাজেই ঘরে বসে মিটিং করা বন্ধ রাখাই শ্রেয়।

ইতিমধ্যে ল্যান এবং তাঁর সতীর্থরা জনসাধারণকে মুখোশ পরে থাকতে বলছেন, তার মধ্য দিয়ে সংক্রমণের মাত্রা নামানো যাবে বলেই তাঁদের অভিমত। এশিয়ার বহু দেশেই মুখোশ একটা আটপৌরে উপকরণ। আমেরিকায় এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশে অবশ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকরা সাধারণ মানুষকে মুখোশ পরা থেকে নিবৃ্ত রাখতে চায়। তার একটা কারণ হল, এই উপকরণটির সরবরাহ কম এবং স্বাস্থ্যকর্মীদেরই সেটা আগে দরকার। চেক রিপাবলিক এবং স্লোভাকিয়া অবশ্য বাড়ির বাইরে বেরলেই সকলের মুখোশ পরা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। ট্যাং মনে করেন, এরা ঠিক কাজই করেছে। ‘‘ওরা সাউথ-ইস্ট এশিয়ার ধারাটা নিয়েছে, যদি প্রত্যেকে মুখোশ পরে তাহলে এটা দোফলা অর্থাৎ দ্বিগুণ সুরক্ষা দেবে।’’

অবশ্য, কাউলিং-এর মতে, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে এমন  মানুষ এবং সহজে আক্রান্ত হতে পারে এমন জলগোষ্ঠীর জন্য মুখোশের পর্যাপ্ত সরবরাহ সুনিশ্চিত করার পরেই কেবল সকলকে তা পরতে বলা উচিত।

অনুবাদ: যুধাজিৎ দাশগুপ্ত

Is the coronavirus airborne? Experts can’t agree শিরোনামে Dyani Lewis-এর এই লেখাটি বেরিয়েছিল নেচার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে, ২ এপ্রিল ২০২০ (doi: 10.1038/d41586-020-00974-w)



Saturday, April 4, 2020

নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে ভাইরাস!

নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে ভাইরাস!

 রবার্ট এফ সারভিস


করোনাভাইরাস। CDC / Alissa Eckert, MS, Dan Higgins, MAM. [Public domain image]





আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স (এন.এ.এস.) একটা অস্বস্তিকর ভাবনা উসকে দিল। এঁরা বলছেন, কেবল হাঁচি-কাশির সঙ্গে ছিটকে বেরনো অণুবৎ বিন্দু থেকে নয়, নয়া করোনাভাইরাস বাতাসে ভর করেও ছড়াতে পারে। যতটুকু গবেষণা হয়েছে তা থেকে নিশ্চিত কোনও বার্তা মিলছে না, কিন্তু হার্ভে ফাইনবার্গ লিখছেন, ‘‘যেসব পরীক্ষার ফলাফল হাতে এসেছে তাতে মনে হচ্ছে স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস যে এরোসলে রূপান্তরিত হয়েও সংক্রমিত হতে পারে তার সমর্থন মিলেছে।’’ এরোসল হল এমন ক্ষুদ্র কণা যা বাতাসে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকতে পারে। হার্ভে ফাইনবার্গ হলেন ‘ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যান্ড টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি হেলথ থ্রেটস’ নামে এক কমিটির প্রধান। ওপরের বার্তাটি তিনি পাঠিয়েছেন হোয়াইট হাউস অফিস অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পলিসি-র প্রধান কেলভিন ড্রোজেমেয়ারকে।

এতদিন অবধি আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সি.ডি.সি) এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যতত্ত্বাবধায়ক সংস্থাগুলো বলে আসছিল যে, সার্স-কভ-টু-র সংক্রমণের প্রাথমিক মাধ্যম হল অপেক্ষাকৃত বড় মাপের, ধরা যাক প্রায় ১ মিলিমিটার মাপের, অণুবৎ বিন্দু যা নাক-মুখ থেকে হাঁচি-কাশির সঙ্গে বেরিয়ে আসে। মাধ্যাকর্ষণের টানে এই বিন্দুগুলো দু-এক মিটার দূরত্ব পেরনোর আগেই মাটিতে পড়ে যায়। এ-ও ঠিক যে, যার ওপর বিন্দুগুলো পড়ে সেখান থেকে অন্য কারও হাতে লেগে যেতে পারে এবং নাকে মুখে বা চোখে হাত দেওয়ার মাধ্যমে সেসবের দ্বারাও সে মানুষটি আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু যদি সত্যিই ধরা পড়ে যে, করোনাভাইরাস নিশ্বাসের সঙ্গে অতি হালকা যে-বাষ্প বেরয় তার ভেতরেও ভেসে থাকতে পারে, তবে মানতেই হবে অন্যদের পক্ষে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা বেশ দুরূহ কাজ। এটা সত্যি হলে জনসমক্ষে আসা প্রত্যেকে মানুষেরই মুখ-ঢাকা মুখোশ পরার পক্ষে যে-দাবিটা উঠেছে, সেটাও তখন জোর পেয়ে যাবে। যার দেহে রোগের লক্ষণ তখনও ফোটেনি অথচ যে এই ভাইরাসের বাহক, অজান্তে তার দ্বারা সংক্রমিত হওয়া ঠেকানোর জন্য এই মুখোশ ধারণ জরুরি হয়ে উঠবে।

বিতর্কের শুরু যখন নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন এই বছরের গোড়ায় একটা গবেষণার ফলাফল বের করে। সেই গবেষণা বলছে, সার্স-কভ-টু এরোসল বিন্দু হয়ে ভেসে থাকতে পারে। ৫ মাইক্রনেরও ছোট এই বিন্দুগুলো বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে প্রায় ৩ ঘন্টা অবধি, এবং তাদের সংক্রামক চরিত্রও বজায় থাকে।

আরও একটি পরীক্ষার উল্লেখ করেছেন ফাইনবার্গ এবং এন এ এস-এর সতীর্থরা। তার একটা হল ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কা মেডিক্যাল সেন্টারের জোশুয়া সান্তারপিয়া এবং তাঁর সতীর্থদের কাজ। তাঁরা দেখেছেন, কোভিড-১৯ রুগীদের আলাদা করে রাখা এক ঘরের বাতাসে ভাইরাসের আরএনএ রয়েছে। রোগীদের থেকে দুই মিটারেরও বেশি দূরত্বের বাতাসে ভাইরাস আরএনএ পাওয়া গেছে, এমনকী সেটা মিলেছে ঘরের যেসব কোনায় সহজে কারও নাগাল পৌঁছয় না সেখান থেকেও। তাঁরা বলছেন, আরএনএ থাকার অর্থই হল, ভাইরাসটা এরোসল বেয়েও ছড়াতে পারে। যদিও সরাসরি সংক্রামক কোনও ভাইরাস-কণা তাঁরা সেখানে পাননি।

আর-একটা গবেষণা-ফলাফলের প্রাক-প্রকাশ সংস্করণ থেকে এন.এ.এস.-এর প্রতিবেদক গোষ্ঠী কিছু আশঙ্কার সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা দেখেছেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণগুলো (পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট, পি.পি.ই.) থেকেও সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের য়ুয়ান লিউ পরিচালিত এই গবেষকদল জানাচ্ছেন, স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন তাঁদের পি.পি.ই. খুলে রাখেন, মেঝে পরিষ্কার করেন বা সংক্রমিত এলাকার মধ্য দিয়ে যান তখন তাদের শরীর থেকে বাতাসে সংক্রামক ভাইরাস ফিরে ঢোকার সম্ভাবনা রয়ে যায়। এন.এ.এস. প্রতিবেদকদের মতে, সব কিছু মিলিয়ে ভাবলে, ‘‘হাঁচিকাশি থেকে বাতাসে ঠিকরে আসা অণুবৎ বিন্দু এবং এরোসল, উভয়ের ভেতরেই ভাইরাস-আরএনএ খুঁজে পাওয়ার অর্থ হল, এই পথেও ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে।’’

‘এরোসলাইজেশনের মতবাদটা যে গৃহীত হচ্ছে এটাই আমার কাছে একটা বড় স্বস্তি।’ বলেছেন কিম্বারলি প্রাথের, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান দিয়েগো-র এক রসায়নবিদ। সায়েন্সইনসাইডার-কে পাঠানো একটা ই-মেলে তিনি বলেছেন, ‘এই বায়ুবাহী মাধ্যমটাকে হিসেবে ধরার ফলে বুঝতে সুবিধে হবে যে কেন এই সংক্রমণটা এত দ্রুত ছড়াচ্ছে।’’

মুখোশ পরার যুক্তিটাও জোর পাচ্ছে এর দ্বারা। এন.এ.এস. প্রতিবেদক গোষ্ঠী, হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যান্সি লিউং এবং তাঁর সতীর্থদের লেখা একটা গবেষণাপত্রের উল্লেখ করেছেন। ভাইরাসের সংক্রমণে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হওয়া বেশ কিছু রোগীর হাঁচি-কাশি থেকে ছিটকে আসা অণুবৎ বিন্দু আর এই রোগীরা যে যেখানে আছেন তার বাতাসে ভাসমান পদার্থ এই গবেষকরা সংগ্রহ করেছিলেন। রোগীদের মধ্যে কয়েকজন সার্জিক্যাল মুখোশ পরেছিলেন। মুখোশ পরা থাকলে বাতাসে ভাসমান এরোসল এবং শ্বাসাঘাত-সৃষ্ট অণুবিন্দু দুটোতেই করোনাভাইরাসের আরএনএ কম পাওয়া গেছে। কিন্তু কেবল ইনফ্লুয়েঞ্জায় ভোগা মানুষদের হাঁচিকাশি নিঃসৃত অণুবিন্দুতেই এটা কম পাওয়া গেছে। গবেষকরা বলছেন, যাদের মধ্যে সংক্রমণের লক্ষণ ধরা পড়েছে তারা সার্জিক্যাল মুখোশ পরলে যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ আটকানো যেতে পারে তার স্বপক্ষে একটা কার্যকারণ-মানা প্রমাণ জোগাচ্ছে আমাদের পরীক্ষার ফলাফল।

এরোসল থেকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে এটা অবশ্য বিশেষজ্ঞদের প্রত্যেকে মানতে নারাজ। ২৭ মার্চ হু (ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন) একটা প্রতিবেদনে জানায়, কোনও কোনও বিশেষ অবস্থায় এরোসলের মাধ্যমে সংক্রমণ হয়তো বা সম্ভব, যেমন স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন কোনও মারাত্মক অসুস্থ রোগীকে শ্বাস-নল পরাচ্ছেন। কিন্তু, হু-বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, চিনের ৭৫০০০-এরও বেশি করোনাভাইরাস আক্রান্তের উদাহরণ থেকে বলা যেতে পারে, কোনও ক্ষেত্রেই বাতাসবাহী সংক্রমণের কোনও প্রমাণ নেই। বিজ্ঞানী সানন্তারপিয়া প্রমুখের গবেষণা প্রসঙ্গে এই বিশেষজ্ঞদের মত হল, পিসিআর যন্ত্র মারফত বাতাসের নমুনা বিশ্লেষণ করে ভাইরাসের আরএনএ খুঁজে পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, তাতে সংক্রমণ ঘটানোর যোগ্য ভাইরাস আছে।

তবে, এই বিতর্কের পর সি.ডি.সি. আপাতদৃষ্টিতে তাদের অবস্থানটাকে একটু ঝালিয়ে নিতে চলেছে। বেশ কয়েকটা সংবাদে প্রকাশ পেয়েছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আটকানোর জন্য এই সংস্থা আমেরিকার প্রত্যেককে জনসমক্ষে বেরনোর সময় মুখোশ পরার সুপারিশ করতে চলেছে।

অনুবাদ: যুধাজিৎ দাশগুপ্ত

-

২ এপ্রিল ২০২০ এই প্রতিবেদনটা You may be able to spreadcoronavirus just by breathing, new report finds শিরোনামে অনলাইন প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্সম্যাগ-এ। সায়েন্সম্যাগের প্রকাশক ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স’।



Sunday, February 2, 2020

গাছ জানে



গাছ জানে




সুজান সিমার



কোস্ট স্যালিশ মানুষেরা বলে, ‘আমরা সকলে এক’। হাজার হাজার বছর ধরে তারা সেই মন্ত্র মেনেই জীবন কাটিয়েছে। কিন্তু আমরা সেদিকে নজর দিইনি। আমরা প্রায় সকলেই ভুলতে বসেছি যে আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে জুড়ে আছি। জুড়ে আছি প্রকৃতির সঙ্গে। আমরা প্রত্যেকে একটিই সত্তা তা বলে প্রকৃতিও আলাদা কিছু নয়, আমরা তারই অঙ্গ। পৃথিবীতে আমরা যা কিছু করি, তার ঢেউ ছড়ায় গোটা ইকোসিস্টেমে, আমাদের প্রত্যেককে জুড়ে থাকা জালিকাবিন্যাসের মধ্যে। এর লক্ষণগুলোও তো এখন আর কিছুতে অস্বীকার করা যাচ্ছে না! জলবায়ু বিপাক, প্রজাতির বিলোপ, মানুষের দুর্দশা এ সবই সেদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করছে। আমরা তা ভুলেছি।

কোস্ট স্যালিশ (Coast Salish*) মানুষেরা বিশ্বাস করে, সমস্ত মানুষ অরণ্যের আত্মার সঙ্গে, সমুদ্র ও নদীর আত্মার সঙ্গে, ভাল্লুক ও স্যামন মাছের আত্মার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জোড়া। আমরা তাদের সে-বিশ্বাসকে অগ্রাহ্য করি।
সত্যিই, জটিল এই প্রকৃতির সংগঠনের মূলে রয়েছে যে আন্তঃসম্পর্ক তাতে ভরসা রাখা, তাকে শ্রদ্ধা করা, এ শেষ অবধি একপ্রকার বিশ্বাস বই আর কী! আমরা তাকে অবৈজ্ঞানিক বলি। পশ্চিমি বিজ্ঞান দাবি করে নিখুঁত পরিমাপ, চোখে আঙুল দেওয়া প্রমাণ, পরিসংখ্যান। ভুলে যাবেন না, কোস্ট স্যালিশ মানুষেরা কম বৈজ্ঞানিক নয়। তা না হলে তারা কী করে এখানে বেঁচে আছে গত দশ হাজার ধরে, তাও এমন সমৃদ্ধির সঙ্গে?

সত্যি বলতে কী, তারা আমাদের থেকেও বেশি বিজ্ঞানভাবাপন্ন। আমরা যদি আরও গভীরভাবে ভাবতে বসতে পারতাম তো আমাদের তথাকথিত উন্নয়নের চাকা বসে যেত। ওই অরণ্যগুলোতে আছে বৃক্ষ, আমাদের বাড়ি বানাতে লাগবে কাঠ। আমাদের প্রিন্টারগুলোকে খাওয়াতে হবে কাগজ।  

কথা হচ্ছে, এসবের ভেতর আমি এলাম কী করে?

তবে বলি, আমার পরিবারের পেশা ছিল গাছ-কাটা। আমার বাড়ির লোকেরা যখন পাহাড়ের ঢালের ওপর দিকে গাছে কাটছে, এখানে একটা, ওখানে একটা, সেখানে একটা - আমি তখন নীচের জঙ্গলে খেলে বেড়াচ্ছি। দেখা-অদেখা নানাখানে। গাছের ফাঁকেফোকরে, কাটা গুঁড়িগুলোর ভেতর দিয়ে, জঙ্গলের জমিতে।

আমার বিশ্বাস ছিল, পরীরা বাস করে ওখানে। তারা ওখানে বাস করে, আর জঙ্গলটাকে রক্ষা করে, ঠিক যেমনটা কিনা আমার কাজ বলে আমি ভাবতাম। কিন্তু পরীরা পারেনি জঙ্গলটাকে বাঁচাতে। আমিও না। সত্যি বলতে কী, পারেনি কেউই।

পারেনি, কারণ এ অরণ্যের যিনি মালিক তাঁকে গাছগুলো কেটে ফেলতে হচ্ছিল তাঁর পরিবারের মুখে আহার তুলে দেবার জন্যই। কিন্তু সেইসব মুহূর্তই আমাকে বদলে দিল সারাজীবনের নামে। সত্যি বলতে কী, আমাকে দিল প্রেরণা। আমি ফরেস্ট্রি নিয়ে পড়তে ঢুকলাম। আমি বুঝতে চাইলাম, কী সে রহস্য যার জন্য অরণ্যকে আমার এত প্রবল শক্তিধর বলে মনে হয়! আমি জঙ্গল বাঁচাতে চাইছিলাম।

ভাগ্যের পরিহাস বলে ঠেকবে হয়তো, কারণ ফরেস্ট্রি পাঠ সাঙ্গ করে বেরনোর পর প্রথম যে চাকরি পেলাম তার কাজ ছিল অরণ্যের প্রাচীন অংশগুলোকে চিহ্নিত করা, যাতে সেগুলো একলপ্তে কেটে বন সাফ করে ফেলা যায়। তার পর সেখানেই ফার আর পাইন গাছের চারা লাগানো হবে, কেননা সেগুলোর বাড় খুব দ্রুত। সেইসঙ্গে অবাঞ্ছিত গাছ, যেমন অ্যাল্ডার, বার্চ, অ্যাস্পেন, এগুলোকে নির্মূল করে হঠিয়ে দেওয়া হবে। কেন হঠানো হবে? কারণ আমরা মনে করতাম ওগুলোর জন্য আমাদের লাভ কমে যাচ্ছে, গাছগুলো আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী।

তো, ঝকঝকে সার-সার একই প্রজাতির গাছের নতুন বন, যাকে মোনোকালচার বলি, তা বসানোর কাজে আমি বেশ দড় হয়ে উঠলাম। কিন্তু প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমতে থাকল।

কেন এই গাছগুলোতে এত রোগ ছড়াচ্ছে?

বার্চ কাটলে কেন ফার গাছগুলো রুগ্‌ণ হয়ে পড়ছে?

হ্যাঁ, আরও ছিল প্রাচীন অরণ্য কেটে সাফ করার হার এত বাড়ছিল সেটাতেই আমি শঙ্কিত হয়ে পড়ছিলাম। আমি ফরেস্ট্রি স্কুলেই পড়েছিলাম যে প্রায় এক শতাব্দি আগে থেকে কানাডায়, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায়, সমস্ত দিম অরণ্য কেটে সাফ করার পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল। এ আমি জানতাম, স্কুলেই পড়েছি। তবু এটা বুঝতে আমার অনেকদিন লেগে গেল যে, এই বৃক্ষচ্ছেদন বন্ধ হবার নয়। এই ভাবনাতেও ছেদ পড়ার নয় যে, আদিম এই অরণ্য কেটে ফেলে সেখানে ছিমছাম বিপণনযোগ্য গাছ লাগানোই শ্রেয় কাজ। 

অথচ আমার কেবলই মনে হচ্ছিল অরণ্যের যেটুকু চোখে পড়ে তার বাইরেও রয়ে গেছে আরও অনেক রহস্য। আমি তাই গ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কাজ শুরু করলাম, মাটির নীচে কী আছে তা জানবার আগ্রহ আমাকে পেয়ে বসল। আমি বুঝতে চাইলাম কেন আদিম অরণ্যগুলো এত বলিষ্ঠ।

আমার নজরে এল যুক্তরাজ্যে করা একটা গবেষণা, সেখানে তারা গবেষণাগারে চারাগাছ বড় করে তোলার সময় একধরনের ছত্রাকের সন্নিবেশ ঘটিয়েছিল। সেগুলো ছিল মাইকোরাইজাল ফাংগাস (Micorrhizal Fungus)এই ছত্রাকগুলো চারাগাছের শেকড়গুলোকে ঘিরে একটা পরস্পরসংযুক্ত জাল তৈরি করেছিল, আর সেই জাল একটা চারাগাছ থেকে অপর চারাগাছে পৌঁছে দিচ্ছিল কার্বন।

মাইকোরাইজাকে বলা যেতে পারে ছত্রাক-শেকড়, এর আক্ষরিক অর্থটাই তাই। গাছের সঙ্গে তাদের তৈরি হয়েছে এক মিথোজীবী সম্পর্ক, এগুলো মাটিতে বেড়ে চলে, মাটি থেকে জল আর জরুরি উপাদান সংগ্রহ করে সেগুলো গাছকে পৌঁছে দেয়, তার বদলে পায় সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত কার্বন। এটাকে বলতে পারি সিমবায়োটিক, মিউচুয়ালিস্টিক, রেসিপ্রোকাল সম্পর্ক।

আরও যা বিস্ময়কর ঠেকল আমার কাছে সেটা হল, ছত্রাকগুলো মাটির তলা দিয়ে পরস্পর গাছগুলোকে জুড়ে দিতে পারে। আমার মাথায় ভাবনা ঢুকল, এমনও কি হতে পারে যে, বার্চের জঙ্গলে ছড়িয়ে থাকা ছত্রাকগুলো ফার গাছের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ঘটায়, আর তার ফলে ফার গাছগুলো রক্ষা পায়এটা আমাকে খুঁজে দেখতে হবে। 

আমি তাই কয়েকটা পরীক্ষা সাজালাম। আমার প্রথম প্রশ্নটা ঘুরে সেই বিশ্বাসের দরজাতেই এল। আমাদের চোখে পড়ে না যদিও, তবু এমন কি হতে পারে যে, এই মাইকোরাইজাল ছত্রাকগুলো মাটির তলা দিয়ে গাছের সঙ্গে গাছকে জুড়ে দিচ্ছে?


যেটা ধরা পড়ল তা হল, হ্যাঁ, প্রকৃত অরণ্যে সেটাই ঘটছে। ডিএনএ মাইক্রোস্যাটেলাইট কাজে লাগিয়ে আমরা ডগলাস ফারের এক আদিম অরণ্যে সেটাই আবিষ্কার করলাম। এই ছবিতে বৃত্তগুলো এক একটা ডগলাস ফার বোঝাচ্ছে। বৃত্তটা যত বড় আর তার রং যত ঘন, গাছটা তত বড় আর তত প্রাচীন। মাঝামাঝি যে ছোট ছোট হালকা রঙের বৃত্তগুলো আছে সেগুলো জঙ্গলের নীচের থাকে বেড়ে উঠতে থাকা চারাগাছ।

আর ওই বৃত্তগুলোকে পরস্পর জুড়েছে যে-রেখাগুলো সেগুলো হল পরস্পরসংযোগকারী মাইকোরাইজাল ছত্রাকে গড়া প্রবাহপথ, হাইওয়ে। খেয়াল করে দেখুন, সবথেকে বড়, সবথেকে গাঢ় রঙের বৃত্তগুলোর সঙ্গেই অন্যান্য বৃত্তের সংযোগ ঘটেছে সবথেকে বেশি। আমরা এগুলোকে বলি হাব ট্রিজ’ (Hub Trees), কেন্দ্রীয় গাছ। পরে ভালবেসে এগুলোকে ডাকতে থাকি মাদার ট্রিবলে, কেননা এটাও ধরা পড়ে যে এই জননী বৃক্ষগুলোই জঙ্গলের নীচের থাকে বেড়ে উঠতে থাকা নবীন চারাগাছগুলোর পরিচর্যা করে।

ছবিতে যেটা দেখছেন তা মাত্র দুধরনের ছত্রাক কাজে লাগিয়ে তৈরি একটা ম্যাপ, ওরকম প্রায় একশো ছত্রাক কোনও জঙ্গলে আছে বলে আমরা মনে করি। ভাবতে পারছেন ওই একশো রকম ছত্রাকের সংযোগরেখাগুলো ম্যাপে আঁকতে পারলে কেমন দাঁড়াত!

এর পর আমার জিজ্ঞাসাটা দাঁড়াল, এই সংযোগবিন্যাসের মধ্য দিয়ে যা প্রবাহিত হচ্ছে সেটা কী?

দেখা গেল সেটা আর কিছু নয়, একটা গাছের বেঁচে থাকার জন্য, বেড়ে ওঠার জন্য যা-যা দরকার, সেইসব। কার্বন, বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান আর জল। আমরা এই কাজে ব্যবহার করেছিলাম আইসোটোপ। কার্বন আইসোটোপ। তা দিয়ে গাছগুলোকে চিহ্নিত করলাম এবং দেখলাম কার্বন কীভাবে এই নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে যাওয়া-আসা করছে ঠিক যেন ইন্টারনেটের মধ্য দিয়ে বার্তার যাওয়া-আসা। খনই কোনও চারাগাছ কষ্টে থাকে, হয়তো সে খুবই ছোট, অথবা এর ওপর সূর্যালোক পড়ে না, কিংবা পুষ্টি উপাদান জোটে না যথেষ্ট, কিংবা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝামড়ে যাচ্ছে তখনই অন্য গাছগুলো তাকে পাঠায় কার্বন। আমরা বার করতে পেরেছি যে, এখানে উৎস গাছ থেকে উদ্দিষ্ট গাছ বরাবর পুষ্টি-উপাদানের একটা ক্রমিক তর-তম আছে, যাকে আমরা বলি সোর্স-সিংক গ্রেডিয়েন্ট। তার অভিমুখটা ধরা যাক, যথেষ্ট আলোকিত তাগড়া কোনও বার্চ গাছ থেকে অরণ্যের নীচের থাকের বাসিন্দা কোনও অভাবি ফার গাছের দিকে। আর এ সমস্ত যে ঘটছে তাতে উৎস গাছটার কোনও ক্ষতিও হচ্ছে না। 

আমাদের পরবর্তী জিজ্ঞাসাটা হল, বেশ, জানা গেল এরকমটাই ঘটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এতে অরণ্যের কীদেখা গেল, একটা গাছ যদি ছায়ায় ঢাকা থাকে, ধরা যাক ডগলাস ফার যদি ছায়াচ্ছন্ন হয়, তবে বার্চ তার নিজের কার্বনের এক-দশমাংশ তাকে পাঠায়। সেটা কিন্তু অনেক কার্বন। তা কাজে লাগিয়ে ডগলাস ফার অবশ্যই তার বীজ তৈরি করে ফেলতে পারবে। 

ঘটনা হল, এই পরিমাণটা ঠিক কী বোঝায় তা আমরা তেমন ভালভাবে বের করতে পারিনি, কিন্তু এটা জানি যে এভাবে উপাদান সরবরাহের ফলে গাছগুলোর বৃদ্ধির হার বাড়ে, বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা বাড়ে। অরণ্যের একেবারে নীচের তলাকার চারাগাছগুলোর স্বাস্থ্য ভাল হয়। 

আমি কয়েকটা উঁচুমানের জার্নালে আমার কাজ নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলাম। তার মধ্যে একটা লেখা খুব সাড়া জাগিয়েছিল। প্রচুর মানুষ এ থেকে উৎসাহ পাচ্ছিলেন। সত্যি বলতে কী, এই গবেষণাপত্র থেকে প্রেরণা নিয়ে পৃথিবী জুড়ে এই বিষয়ে নতুন নতুন গবেষণার সূত্রপাত হচ্ছিল। 

তবে বিরুদ্ধ সমালোচকরাও ছিলেন, তাঁরা আমার কাজকে পাত্তা দিতে চাননি। সমালোচনা করে অনেক প্রবন্ধ লেখা হচ্ছিল, অনেক বক্তৃতাসভার প্রারম্ভিক কথনে উত্থাপিত হচ্ছিল এর বিরুদ্ধ মত, পত্রপত্রিকায় বিবৃতি পাঠানো হচ্ছিল। আমার নিজের প্রতিষ্ঠানের কথা যদি ধরি তো বলতে হয় তারা আমার ফাইলে গুঁজে দিল প্রফেশনাল এথিকস সংক্রান্ত চেতাবনি। আমার কাজ নাকি নিতান্ত এলোমেলো অগোছালো বেখাপ্পা এদেশে যাকে ব্যঙ্গ করে বলে ডগস ব্রেকফাস্ট

আমি জানি এটা আপনাদের কাছেও অজানা নেই যে, যখনই কোনও নতুন দিশার সন্ধান দেয় কোনও গবেষণা, যখন তা চলতি স্থিতাবস্থাটাকে ভেঙে ফেলতে চায়, তখনই এ ধরনের ভয়-দেখানো ব্যাপার চলতে থাকে। এটা যখন বুঝতে পেরেছি তখন আর থামা নেই। আমার সায়েন্সটা যে নিশ্ছিদ্র, কাজটা রীতিমতো খুঁটিয়ে করা, সেটা তো আমি জানি। আমি এ-ও জানি যে একদিন এই কাজটা পরিবেশ নিয়ে আমাদের ভাবনাটাকে পুরো বদলে দেবে। 

কাজেই, রীতিমতো উজ্জীবিত হয়ে আমি আমার গোড়ার প্রশ্নে ফিরে গেলাম, কারণ তখনও তার উত্তর ঠিকভাবে আমার হাতে আসেনি। একটা ভাবনা আমাকে খোঁচাতে থাকল যে এইসব পারস্পরিক সংযোগ, এই যে সম্পর্কের আন্তর্জাল, এ কি কেবলই পুষ্টি উপাদান, কার্বন আর জল আদানপ্রদানের রাস্তা? যে-গাছটা পীড়িত, যার রোগ হয়েছে, তাকে কি সত্যি সত্যি তার প্রতিবেশী স্বাস্থ্যবান গাছগুলো কোনও উপকার জোগাতে পারে? বার্চ কি ফার-এর সহায়

কাজেই আমি আরও কিছু পরীক্ষা করলাম, এবং দেখলাম, হ্যাঁ ঠিক তাই। ডগলাস ফার যখনই পীড়া বোধ করে, যখনই তার রোগ হয়, সে তার প্রতিবেশী গাছেদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠাতে থাকে। আর প্রতিবেশীরা তাতে সাড়া দেয় আরও বেশি বেশি করে প্রতিষেধক এনজাইম বানিয়ে। এর সুবাদেই প্রতিবেশী গাছগুলো নিজেরা রোগপ্রতিরোধী হয়ে ওঠে। যদি এই প্রতিবেশীদের একটি গাছ হয় কোনও বার্চ, তবে ফার গাছটির কাছেও সাহায্য এসে পৌঁছয় ওই পারস্পরিক সংযোগজালের সঙ্গে জড়িত অ্যান্টিবোয়োটিক উৎপাদনক্ষম ব্যাকটিরিয়া মারফত। ব্যাপারটা অনেকটা আমজনতাকে টিকা দেওয়ার মতো।

আমি ভাবতে বসলাম, প্রতিরোধক বিপদবার্তার চলাচল ছাড়া আরও কিছু কি আছে আর মধ্যে? কী দেখলাম? দেখলাম গাছেরা তাদের নিজেদের আত্মীয়দের চিনে নিতে পারে, তাদের সঙ্গে বার্তা বিনিময় করতে পারে। কোনও জননী গাছ ঠিকই চিনতে পারে আশপাশের চারাগাছগুলো তার নিজের সন্তান, নাকি অপরিচিত কেউ। অপরিচিত চারাগাছকে সে যত কার্বন পাঠায় তার থেকেও বেশি পাঠায় নিজের আত্মীয় চারাগাছগুলোকে। জননী গাছ যদি কখনও আহত হয় সে তার আত্মীয় চারাগাছগুলোকে আরও বেশি বেশি কার্বন পাঠাতে থাকে। যেন সে তার শক্তি, তার যা কিছু অর্জন সে যেন তার পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

আমি যতই এই সমস্ত বিষয়গুলো একসঙ্গে ভাবতে বসি, আমার মনে হতে থাকে এইসব গাছ যেন তাদের জীবনের গভীর রহস্যের কথা আমাদের বলে যাচ্ছে। এটা একেবারে আনকোরা একটা ভাবনা। খুবই উত্তেজনা জাগায়। একটা সময়ে এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছিল, বিষয়টা আসছিল পপুলার সায়েন্স হিসেবে, ডকুমেন্টারি ফিল্মে, বার্তাটা ক্রমশ যত ছড়িয়ে পড়ছিল, আমিও ভীষণ ভীষণ উত্তেজনা বোধ করছিলাম। 

কিন্তু, হল কী, আমার ক্যানসার ধরা পড়ল। 

সত্যিই সে এক নিদারুণ কষ্ট। কিন্তু এর একটা সুন্দর দিকও ছিল, আমি আমার নিকটজনদের সঙ্গে যেন নতুন করে সংযুক্ত হলাম। আমার পরিজনরা, আমার আত্মীয়রা আমার দেখভাল করতে শুরু করল। আমাকে ঘিরে রইল তারা। তারা আমাকে ধরে ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওঠাত। তারা আমাকে রেঁধে খাওয়াত। তারা আমার বাচ্চাদের দেখাশোনা করত। আর হাসপাতালে থাকার সময় আমি আরও অনেক বেশি সংযোগ ঘটিয়ে ফেললাম - সেগুলো যেন আরও জোরালো আমার মতো আরও যে-মহিলাদের ব্রেস্ট ক্যানসার হয়েছে তাদের সঙ্গে।

আমাদের আতঙ্ক হত। সত্যিকারের আতঙ্ক। আমরা কাঁদতাম। আমরা হাসতামও বটে। আজও, প্রতিদিন। আমরা পরস্পর এত আঁট হয়ে রইলাম একে অপরের সঙ্গে যেন কাপড়ের ওপর গাঁথা একটা ট্যাপেস্ট্রির কাজ। যখনই কেউ হোঁচট খায়, কেউ টাল হারায়, বাকিরা তখনই ঠিক এসে দাঁড়ায় তার পাশে, তাকে ধরে তোলার জন্য। আর এসবের মধ্য দিয়ে আমি যা শিখলাম, সেটাই, সেটাই আমার অরণ্যভূমি আমাকে গোড়া থেকে বলে আসছিল ভাল থাকার জন্য এই সংযোগটাই মোক্ষম জরুরি। এগুলো সহজে চোখে পড়ে না, কিন্তু এগুলো বাস্তব। আরও কি জানেন আমি নিজেই তার জ্যান্ত প্রমাণ। আর এ জন্য আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।

আমি এখন আবার আমার শক্তি ফিরে পেয়েছি, বিজ্ঞানের কাজে লেগেছি আবার। এবং অন্য আরও কিছু প্রশ্নের পিছু নিয়েছি।
আমার প্রথম, এবং সবথেকে জরুরি প্রশ্নটা হচ্ছে, আমাদের এই আবিষ্কার আজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ানো চরম বিপদের সাপেক্ষে কী বার্তা এনে দিতে পারে

চরম বিপদটা হল ক্লাইমেট চেঞ্জ। জলবায়ু বদলাচ্ছে এবং সেটা কোনও ধাপ্পাবাজি নয়। সত্যি বলতে কী, নিজেদের ধোঁকা দিয়ে তো কোনও লাভ নেই এমন কোনও বাহাদুরি ফলানো টেকনোলজি আমাদের নেই যা দিয়ে এই বিপর্যয় থেকে আমরা উদ্ধার পেতে পারি। আমার আবিষ্কার বলছে, আমার এই প্রশ্নের উত্তরটা, সমস্যার সমাধানটা লুকিয়ে আছে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ভিতর।

কাজটা করার সময় আমি এখানকার আদিবাসীদের মাঝখানে গিয়েছিলাম। আমার গবেষণাটা আমি এই আদিবাসীদের, এখানে যাদের অ্যাবোরিজিনাল মানুষ বলে, তাদের সঙ্গে নিয়েই করছি। আপনারা জানেন নিশ্চয়, এদের জীবিকা নির্ভর করে স্যামন মাছের ওপর। স্যামন মাছের দেখাশোনার মধ্য দিয়ে এদের সঙ্গে মাছেদের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যা তাদের নিজেদের জীবিকারও সহায়ক। তাদের বাঁচবার জন্যই এটা এক অপরিহার্য সম্পর্ক। 

হেমন্তে, স্যামন মাছ যখন নদীতে ডিম পাড়তে আসে, নদীতে নেমে আসে ভাল্লুকের দল। আসে নেকড়ে। স্যামন মাছের আতুঁড় এই নদীগুলো থেকে তারা স্যামন মাছ ধরে খেতে থাকে। আর এই স্যামন তারা বয়ে নিয়ে যায় অরণ্যের ভেতর।

সেখানে, আদিম জননী বৃক্ষের তলায়, জননী বৃক্ষের মেলে ধরা পাতার চাঁদোয়ার তলায়, তারা সেই স্যামন মাছ খায়। হেমন্তে তাদের উচ্ছিষ্ট পচে, গলে, মাটিতে চুঁইয়ে মিশে যেতে থাকে। আমরা মনে করি, ওই যে জননী বৃক্ষের সঙ্গে জড়িত মাইকোরাইজার সুবিস্তৃত জালিকাবিন্যাস, তারা এই নাইট্রোজেন শোষণ করে। বিজ্ঞানীরা গাছের গুঁড়িতে ছাপ-ফেলা বর্ষচক্রে এই স্যামন মাছ থেকে আসা নাইট্রোজেন আবিষ্কার করেছেন। বহু শতাব্দী ধরে সেগুলো সেখানে সঞ্চিত আছে।

এ বছর গ্রীষ্মে আমাদের পরিকল্পনা হল, আমরা আবার জঙ্গলে যাব, গিয়ে দেখব সেখানে সত্যিই মাদার ট্রি থেকে তার প্রতিবেশীদের ভেতর নাইট্রোজেন প্রবাহিত হচ্ছে কি না। আমাদের ধারণা এটাই ঘটছে। নাইট্রোজেন পৌঁছচ্ছে গাছ থেকে গাছে, সেখান থেকে আরও অন্য কোনও গাছে, গভীর থেকে গভীরতর অরণ্যে। আমরা মনে করি এর সঙ্গে অরণ্যের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক জোড়া আছে। আর তার সঙ্গে জোড়া অবশ্যই নদীর স্বাস্থ্য, যেটার সঙ্গে যুক্ত স্যামনরা, যুক্ত রয়েছে স্যামন সমষ্টির সামগ্রিক স্বাস্থ্য, আর সেটা শেষ অবধি ঘুরে যাচ্ছে সমুদ্রে এবং ফিরে আসছে আমাদের কাছে। মানুষের কাছে।

তো, এই যে জীবনের চক্র, আমাদের অ্যাবোরিজিনাল পূর্বপুরুষরা যাকে বলতেন অন্যোন্যক সম্পর্ক’, এটা বস্তুত পারস্পরিক সম্ভ্রমের আদানপ্রদান। বিজ্ঞানীরা যাকে বলছেন এখন কমপ্লেক্স অ্যাডাপ্টিভ সিস্টেমস’, এটা তারই একটা ভাল উদাহরণ।  

ভেবে দেখুন, অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। তরতাজা একটা অরণ্যে সব কিছু সবকিছুর সঙ্গে সংযুক্ত, সবার সঙ্গে সবার বার্তা বিনিময় হচ্ছে।

এই ছবিতে প্রতিটা সংযোগবিন্দু এক-একটা প্রজাতি। তাদের সঙ্গে অবিরত অন্য সকলের সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে। তাদের পারস্পরিক সংক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উদ্ভূত হচ্ছে যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন কমপ্লেক্স অ্যাডাপ্টিভ বিহেভিয়ার’ (Complex Adaptive Behaviour), উচ্চতর সিস্টেম স্তরের গুণাবলি। যেমন সুস্থিতি, সুস্বাস্থ্য, পরিষ্কার বাতাস, পরিষ্কার জলের জোগান অক্ষুণ্ণ রাখা প্রাকৃতিক চক্র।



কিন্তু আপনি জানেন, আধুনিক সমাজে আমরা মনে করি আমরা এসব থেকে আলাদা। আমরা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত, আমরাই সেরা, অথবা ন্যূনতম বিচারে এই সমস্ত উপাদানকেই আমরা পড়ে পাওয়া বলে ধরে নিই।

কিন্তু ঘটনা হল, আমরা যখনই এর মধ্য থেকে মোক্ষম কয়েকটা উপাদানকে সরিয়ে দিই, যেমন ধরা যাক গ্রিজলি বেয়ার, কিংবা ধরা যাক যখন আমরা স্যামনের বংশকে ধ্বংস করে ফেলি তখনই এই সিস্টেমগুলো অতি দ্রুত বিনষ্ট হয়ে যেতে থাকে, সেগুলো ক্রমে হয়ে উঠতে থাকে যাকে আমরা বলি উইকেড স্টেবল স্টেট (Wicked Stable State), দুষ্ট স্থিতাবস্থা।

কিন্তু সেটা তো আমাদের অভীষ্ট নয়। উইকেড স্টেবল স্টেটগুলোর কোনও ধরাবাঁধা নিশ্চয়তা থাকে না, সেগুলোর গতিপ্রকৃতি আগাম বলা যায় না। তুমি একটা কোনও সমস্যা সামলাতে যাবে তো এই দিকে আর-একটা সমস্যা ফুটে বেরবে। আর এখন ঘটনা যেদিকে গড়াচ্ছে, জঙ্গলগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারা পড়ছে, এবং উল্টে সেটা আরও বেশি করে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, ফলে বলা চলে, সবকিছু ভীষণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

কিন্তু এর মধ্যেই একটা ভাল জিনিস লুকিয়ে আছে। ঠিক যে-কারণে এগুলো কোনও পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকা এক-একটা কমপ্লেক্স অ্যাডাপ্টিভ সিস্টেম-এর লক্ষণ, সে-কারণেই আমরা পরিবর্তনের অভিমুখটাকে খারাপ থেকে ভালর দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারি।

কীভাবে সেটা করা যেতে পারে? প্রথমত, আমাদের নিজেদের দিকে নতুন দৃষ্টিতে তাকাতে হবে, মনে করতে হবে আমরা এই নেটওয়ার্কের অংশ। কল্পনা করুন আপনি যেন শুনতে পাচ্ছেন অন্য সমস্ত জীবের কথা। আমরা জমির নীচেকার নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারি, আমরা বহমান কথোপকথনের অংশ হয়ে উঠতে পারি। এটা যদি আমরা সত্যিই করতাম, আমাদের তো ওই অরণ্য থেকে - ডগলাস ফারের অরণ্য থেকে, বার্চ গাছগুলোকে কেটে বাদ দেওয়ার দরকার পড়ত না! কারণ আমাদের তখন নিশ্চিত জানা থাকত এর ফলে অরণ্যের স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়। অথচ আমরা এখনও সেটাই করে চলেছি। 

কিন্তু এখনও আমার মনে যথেষ্ট আশা আছে। আমি জানি, যদি আমরা এই কমপ্লেক্স অ্যাডাপ্টিভ সিস্টেমের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারি, এই যোগসূত্রে আমাদের ভূমিকাটা নির্ণয় করতে পারি, তবে আমাদের ভাবনার ধরনটাকে, আমাদের আচরণের ধারাকেই আমরা বদলে ফেলতে পারব। আমরা তখন এই সুবিশাল সিস্টেমের অঙ্গ হয়ে উঠব। মনে পড়ে, যেখানে বার্চ গাছ থেকে রসদ যাচ্ছিল ফারে, ফার থেকে ফের তা আসছিল বার্চে! মনে পড়ছে তার মানে এটা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, প্রকৃতিতে কোনও অসহিষ্ণুতা নেই, কেবল অন্যোন্যকতা আছে, কেবল পারস্পরিক সম্ভ্রম আছে - আমার ক্যানসারের বিপরীতে সহায়ক মানুষজনের মতো। এটাই আমাদের অনুশীলনের বিষয়।

আর-একবার ফিরে বলি, আমরা যখনই বুঝব আমরা প্রকৃতির মধ্যে ওতপ্রোতভাবে গাঁথা, আলাদা নই, অক্ষরে অক্ষরে এক, তখন আমরা এই সুবিপুল শক্তির অঙ্গ হয়ে উঠতে পারব, যা-কিছু সু, তার পথে চলতে পারব। প্রকৃতিকে একটা শপিং মল হিসেবে দেখা আমাদের বন্ধ করতে হবে। আর যদি সেটা করতে পারি, তবে ভবিষ্যতের পথরেখাটাও আমরা বদলে দিতে পারব।

একসময় মনে করতাম পরীরা অরণ্যের সঙ্গে সংযুক্ত, তারাই তার দেখভাল করে, এখন বুঝছি খুব একটা অন্যরকম কিছু ভাবিনি তখন। বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়েই আমি দেখিয়েছি যে, অদেখা এই যোগসূত্রগুলো সত্যিই রয়েছে। ঠিক যেমনটা কোস্ট স্যালিশ মানুষেরা আমাদের বরাবর বলে আসছিল। তারা আমাদের দেখিয়েছে, বিজ্ঞানও আমাদের দেখিয়েছে, সবকিছু সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত। সবকিছু সবকিছুর সঙ্গে কথা বলছে; সম্ভ্রমের সঙ্গে, পারস্পরিক অন্যোন্যক বোধের সঙ্গে। আমাদের সমাজের ভারসাম্যের মূল লুকিয়ে আছে এর ভেতর। তার মূল নীতিগুলো হল আত্মীয়তাবোধ, বয়স্কজনের প্রতি শ্রদ্ধা। তার থেকে জন্ম নেয় জটিল সম্পর্ক ও অভিযোজনের সামর্থ্য। এখান থেকেই আমরা পাই স্থিতিস্থাপকতা। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে যে-স্থিতিস্থাপকতার প্রয়োজন।

শেষতম আশার বার্তাটা হল এই, আমি আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে, বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে একটা সারসত্য উপলব্ধি করেছি, যে উপলব্ধির অধিকারী আপনারাও। সেটা হল: আমরা সকলে এক। 


[অনুবাদ: যুধাজিৎ দাশগুপ্ত]

-   

সুজান সিমার (Suzanne Simard) ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় ফরেস্ট ইকোলজির অধ্যাপক। টেড-এক্স সিয়াটল এর সভায় এই বক্তৃতাটি (মূল শিরোনাম ছিল Nature's internet: how trees talk to each other in a healthy forest) তিনি করেছিলেন  ২০১৬ সালে। ওপরের বয়ানটি ইউটিউব-এ সিমার-এর বক্তৃতার ভিডিও থেকে অনুবাদ করা। সঙ্গে ব্যবহৃত ছবিগুলিও সেখান থেকেই নেওয়া। 

'টেড কনফারেন্স’ (টেকনোলজি, এন্টারটেনমেন্ট ডিজাইন) একটি আমেরিকান গণমাধ্যম সংগঠন। এঁদের আয়োজিত বিভিন্ন বক্তৃতা, যেসবের বিষয়, এঁদের স্লোগান অনুযায়ী, ‘আইডিয়াজ ওয়র্দ স্প্রেডিং’ - সেগুলো এঁরা অনলাইনে প্রকাশ করেন। 

*কোস্ট স্যালিশ: ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কানাডা ও আমেরিকায় বসবাসকারী এক জনজাতি


ভ্যাকসিন: বিভ্রম আর দুর্ভাবনা

  ভ্যাকসিন: বিভ্রম আর দুর্ভাবনা কৌস্তুভ পান্ডা   সমগ্র মনুষ্যজাতিকে যতরকম সাধারণ শত্রুর সঙ্গে লড়তে হয়েছে, তার কোনওটাই কোভিড-১৯-এর সঙ্গে ...